আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে জোর করে বিএলও-দের দিয়ে একাধিক ‘অনৈতিক’ এবং ‘নিয়ম বহির্ভূত’ কাজ করানো হচ্ছে। এই অভিযোগ তুলে বুধবার মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা বিডিও অফিসে গিয়ে গণ ইস্তফাপত্র জমা দিলেন ওই ব্লকে কর্মরত প্রায় দু’শোর বেশি বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)। একই সঙ্গে এসআইআর-এর শুনানিতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক হয়রানির অভিযোগ তুলে বুধবার দুপুরে ফারাক্কা বিডিও অফিসে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগে সরগরম হয়েছে এলাকা।
জানা গিয়েছে, এদিন দুপুরে হটাৎই কিছু উত্তেজিত জনতা বিডিও অফিসে ঢুকে পড়েন। এরপর তাঁরা বিডিও-র চেম্বারে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। ভেঙে দেওয়া হয় তাঁর ঘরের বেশ কিছু চেয়ার এবং কাঁচের টেবিল। পাশাপাশি ভাঙচুর করা হয় বিডিও-র চেম্বারে রাখা অন্য বেশ কিছু জিনিস। উল্টে ফেলা হয় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। ভাঙচুরের ঘটনার পর বিডিও অফিসে নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত কাজ এদিন থমকে যায়।
ফারাক্কা ব্লকে একসঙ্গে সমস্ত বিএলও-র গণ ইস্তফা দেওয়ার ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা জেলা জুড়ে। তবে জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বিএলও-দের কাজ করতে না চেয়ে দেওয়া গণ ইস্তফাপত্র এখনও পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। তাই সমস্ত বিএলও-কেই তাঁদের নির্দিষ্ট কাজ করে যেতে হবে।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া বা এসআইআর-এর স্বচ্ছতা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচুর বিএলও একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। ইতিমধ্যে একাধিক বিএলও দাবি করেছেন তাঁদেরকে দিয়ে ‘অবৈধ’ এবং ‘অনৈতিকভাবে’ নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে বিভিন্ন কাজ করানো হচ্ছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখে বুধবার ফারাক্কা বিডিও অফিসে গিয়ে ওই বিধানসভা এলাকার সমস্ত বিএলও একসঙ্গে তাঁদের ইস্তফাপত্র জমা দেন।
বিক্ষোভরত এক বিএলও মীর নাজির আলি বলেন, “বিএলও হিসেবে ফারাক্কা ব্লকে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের বেশিরভাগই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। রাজ্য জুড়ে এসআইআর শুরুর একদম প্রথম পর্বে আমাদের জানানো হয়েছিল শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত এবং মৃত ভোটারদের নাম বাদ দিতে হবে এবং আসল ভোটারদের নাম তালিকায় রাখার কাজ করতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “এসআইআর ফর্ম দেওয়া এবং জমা নেওয়ার পরও আমাদের দিয়ে নিত্যনতুন কাজ করানো হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত কাজের জন্য আমাদের কোনও রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না। কেবলমাত্র হোয়াটসঅ্যাপে কিছু নির্দেশিকা পাঠিয়ে আমাদের নতুন নতুন কাজ দেওয়া হচ্ছে। আবার কখনও সকালের নির্দেশিকা রাতে বদলে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাজ আমাদের পক্ষে করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।”
বিক্ষোভরত বিএলও-রা আজ অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে কিছু ত্রুটি থাকার জন্য ২০০২-এর তালিকা সঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকার ছোটোখাটো কিছু তথ্য মিলছে না। তার পাশাপাশি বিএলওদের মোবাইল ফোন অ্যাপ্লিকেশনটিও ঠিকমতো কাজ করছে না। নির্বাচন কমিশন সমস্ত বিএলও-দের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে দেওয়ায় দিন-রাতে যে কোনও সময় ফোন আসছে। সকলের পারিবারিক জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে।
ফারাক্কার একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধানশিক্ষক তথা বিক্ষোভরত বিএলও সৈয়দ তাজ ইসলাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে ভাবে এসআইআর করতে চলেছে তাতে বেশিরভাগ ভোটারের নামই বাদ পড়ে যাবে। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় বহু ভোটারের নামে ভুল ছিল। পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশনের আইন মেনে ৮ নম্বর ফর্ম পূরণ করে অনেক ভোটারই নিজেদের নাম ঠিক করে নিয়েছেন। তাঁদের পক্ষে এখন আর পুরনো নথি পেশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখন সেই সমস্ত নথি দেখতে চাইছে। না হলে এই সমস্ত ভোটারের নাম বাদ পড়ে যেতে পারে নির্বাচকের তালিকা থেকে।”

বিক্ষোভরত বিএলওরা আজ জানিয়ে দেন, বর্তমান পরিকাঠামো এবং অমানবিক ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে তাঁরা আর এসআইআর প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবেন না।
অন্যদিকে, এসআইআর-এর নাম করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে এই অভিযোগ তুলে বুধবার ফারাক্কা বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের অভিযোগ, শুনানির জন্য ডাকা বিভিন্ন মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে শুনানিতে হাজির হচ্ছেন অথচ তাঁদের নথি জমা নেওয়ার কোনও ‘রিসিপ্ট কপি’ দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে আগামী দিন এই ভোটারদেরকে অনুপস্থিত দেখিয়ে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
ফারাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম বলেন, “এসআইআর প্রক্রিয়ায় মানুষের হয়রানির জন্য কিছু মানুষ আজ ভাঙচুর চালিয়েছেন। বিএলও-রা গণ ইস্তফা দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচন কমিশন যেভাবে এসআইআর করতে চাইছে তাতে ‘রামের’ নাম থাকলে তাঁর কোনও নথি না থাকলেও এসআইআর পর্বে তাঁকে কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। কিন্তু কোনও ব্যক্তির নাম ‘রহিম’ হলে তাঁকে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই দ্বিচারিতা বন্ধ করতে হবে।”
বিধায়ক বলেন, “ফারাক্কার মানুষকে বাঁচাতে গেলে যদি গুলি খেতে হয় আমি তাতেও রাজি। কোনও ব্যক্তির ৬-৭ জন সন্তান থাকলে তাঁকে অদ্ভুত সব কাগজ দেখাতে বলা হচ্ছে। আমরা আর কোনও কাগজ দেখাব না। বিডিও অফিসে ধরণা চলবে।”
অন্যদিকে, এসআইআর শুনানি ঘিরে পূর্ব বর্ধমানের বিক্ষোভে জ্বলল আগুন। পোড়ানো হল কুশপুতুল। কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নয়। শুধু নাগরিক সমাজের নামে সংগঠিত হয়েছে এই বিক্ষোভ। সামিল অসুস্থ, হুইলচেয়ারে বসা মানুষ, বয়স্করাও। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কাজ চলাকালীন সব রকম অসুবিধা নিয়ে শুনানিতে আসতে হচ্ছে। তাই তাঁরা এভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
যদিও পূর্ব বর্ধমানে মঙ্গলবার থেকেই দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভের এই নতুন ধরণ। নবদ্বীপ রোডের নাড়াগোহালিয়ায় আগুন জ্বেলে,কাঠের গুড়ি ফেলে অবরোধ হয়। ভাতারে বিক্ষোভে উত্তাল হয় ব্যস্ত রাস্তা। বুধবার কাটোয়া রোড এবং কেতুগ্রামেও বিক্ষোভ চলে। যে সমস্ত মুখ এই বিক্ষোভের সামনে আছেন, তাঁরা কেউ নেতা নন। এর সঙ্গে আছেন একেবারে সাধারণ মানুষ। তাঁরাই এই বিক্ষোভের সামনের সারিতে। বুধবার বিক্ষোভের জেরে ব্যস্ত এসটিকেকে রোড স্তব্ধ হয়ে যায়। যানবাহন দাঁড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের অনুরোধে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা।
