আজকাল ওয়েবডেস্ক:  বহু বছরের ক্ষোভ, অপমান আর বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়েই মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবার আদালত চত্বরে হাজির হলেন ফলতার বাসিন্দা খুরশিদ খাঁ। হাতে ছিল পচা ডিম— যা তাঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের প্রতীক। জাহাঙ্গির খান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এদিন আদালত চত্বরে এই ব্যতিক্রমী বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর অভিযোগ, ২০১৭ সালে জমি-জমা সংক্রান্ত বিবাদের জেরে তাঁর পরিবার ভয়াবহ অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। সেই ঘটনার ক্ষত আজও শুকোয়নি।


খুরশিদ খাঁর দাবি, ২০১৭ সালে ফলতা এলাকায় জমি নিয়ে বিবাদ চরম আকার নেয়। সেই সময় জাহাঙ্গির খান ও তাঁর অনুগামীরা পরিকল্পিতভাবে তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়, আসবাবপত্র নষ্ট করে এবং পরিবারের সদস্যদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল যে পরিবারের সদস্যরা প্রাণভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন।


সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিযোগ, ওই হামলার সময় ইট ছোড়া হলে গুরুতর জখম হয় খুরশিদের মাত্র ছয় বছরের কন্যা। শিশুটির মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে বলে দাবি পরিবারের। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি বলে অভিযোগ।

নিজের মেয়ের মৃত্যু প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আদালত চত্বরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন খুরশিদ। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের কোনও দোষ ছিল না। বড়দের জমি বিবাদের বলি হতে হল একটা নিষ্পাপ শিশুকে। এত বছর কেটে গেল, কিন্তু আমি বিচার পেলাম না।”


খুরশিদের অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তাঁর দাবি, ঘটনার পর প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাঁকেই উল্টে একাধিক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসনের একাংশের মদতে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সেই চাপ এবং আতঙ্কের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে এলাকা ছেড়ে ঘরছাড়া জীবন কাটাতে হয়েছে। নিজের বাড়ি, পরিবার এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বছরের পর বছর কাটানোর যন্ত্রণা এদিন স্পষ্ট ছিল তাঁর কথায়।
তিনি জানান, বহুবার বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরে অভিযোগ জানিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানানো থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চস্তরে আবেদন— সব পথেই নাকি হতাশ হতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর কথায়, “আমি বারবার বিচার চেয়েছি। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টে আমাকেই হেনস্থা করা হয়েছে।”


শনিবার আদালত চত্বরে পচা ডিম হাতে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে কৌতূহল ছড়ায়। আশপাশের বহু মানুষ তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করেন। খুরশিদ জানান, পচা ডিম নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়, বরং প্রতীকীভাবে তাঁর ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা। তাঁর মতে, যাঁদের কারণে তাঁর পরিবার ধ্বংস হয়েছে, তাঁদের প্রতি সমাজের ঘৃণাই এই প্রতিবাদের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।


ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হলেও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। যদিও এদিন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।


এই ঘটনায় নতুন করে জাহাঙ্গির খান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে জনরোষ সামনে এল বলে মনে করছেন স্থানীয়দের একাংশ। বহু পুরনো অভিযোগ ফের প্রকাশ্যে আসায় এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও চর্চা শুরু হয়েছে। খুরশিদ খাঁর দাবি, তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, তাঁদের মতো সমস্ত অত্যাচারিত মানুষের পক্ষ থেকেই প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। তাঁর একটাই আবেদন— বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক।

 

&t=4s
ডায়মন্ড হারবার আদালত চত্বরে এক পিতার এই নীরব অথচ তীব্র প্রতিবাদ যেন আবারও মনে করিয়ে দিল— বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না, বরং আরও গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়।