আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথম ধুমধাম করে পালিত হল পশ্চিমবঙ্গ দিবস। আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে শনিবার রাজ্যে এলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হুগলির তারকেশ্বরের সভামঞ্চে এদিন একেবারে অন্যরকম আবেগ আর উদ্দীপনার ছবি ধরা পড়ল। শনিবার দুপুরে দমদম বিমানবন্দরে নেমে কপ্টারে বিকেল ৪টের কিছু পরে তারকেশ্বরের সভাস্থলে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্যপাল আরএন রবি। বাংলার চিরাচরিত আতিথেয়তায় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে কোনও খামতি রাখেননি মুখ্যমন্ত্রী। ডোকরার তৈরি অপরূপ দুর্গামূর্তি, বাবা তারকনাথের ছবি এবং অবশ্যই বাংলার বিখ্যাত রসগোল্লা ও জলভরা সন্দেশ তুলে দেওয়া হয় মোদির হাতে।

নতুন সরকারের আমলে ২০ জুন দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এদিনের মঞ্চ থেকে সেই ইতিহাসের কথাই বারবার তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৭ সালের এই দিনেই পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাশ হয়েছিল, যার নেপথ্যে বড় ভূমিকা ছিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। নিজের ভাষণের শুরুতেই 'জয় বাবা তারকনাথ' এবং 'হর হর মহাদেব' ধ্বনি তুলে মোদি বলেন, রাজ্যে ভোট ও শপথগ্রহণের পর এই প্রথম তিনি এলেন এবং বাংলার বাতাসে এখন তিনি এক নতুন সুগন্ধ পাচ্ছেন, যেন বাংলা আজ বেড়ি ভেঙে স্বাধীন হয়েছে। ঐতিহাসিক এই দিনটিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে মেঘনাথ সাহা, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং মতুয়া ঠাকুরদের অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি। পাশাপাশি, রাজ্যের নতুন ডাবল ইঞ্জিন সরকার যে দ্বিগুণ গতিতে উন্নয়নের কাজ করছে, তা মনে করিয়ে দিয়ে এদিনই রেল, কৃষি এবং মৎস্যপালন দপ্তরের প্রায় ৮২০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বক্তব্যের পাশাপাশি, পূর্বতন সরকারদের দিকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বিগত তৃণমূল এবং তার আগের সিপিএম সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আগের সরকারগুলি ইতিহাসকে বিকৃত করার এবং তোষণনীতির রাজনীতি করে বাংলার শুধু ক্ষতিই করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এই পুণ্যভূমিতে বিদেশি চিন্তাধারা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তবে বর্তমানে মানুষ বিজেপিকে আশীর্বাদ করায় এবং অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর অপচেষ্টা রুখে দেওয়ায় সেই অন্ধকার দূর হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি, পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দিয়ে 'স্বচ্ছতা সে স্বাগত' কর্মসূচির জন্য রাজ্যবাসীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে তারকেশ্বরের নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক রাখা হয়নি। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারির পাশাপাশি, সভাস্থলের সাজসজ্জা ছিল চোখে পড়ার মতো। থাইল্যান্ডের অ্যান্থোরিয়াম, উটির জারবেরা ও লিলির মতো ফুলের পাশাপাশি পাঁচ রকমের গোলাপ, ব্লু ডেইজ়ি, রজনীগন্ধা ও গাঁদা দিয়ে সাজানো হয়েছিল মূল মঞ্চ। সভাস্থলের দু'পাশে পাঁচটি হ্যাঙারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চারপাশ কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি, টানা রিকশা, দক্ষিণেশ্বর মন্দির এবং বেলুড় মঠের ছবির মাধ্যমে যেন আস্ত এক টুকরো বাংলাকে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে আসার আগেই শনিবার সকালে সমাজমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্ট করে বাংলার সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, বিজ্ঞান ও সমাজ সংস্কারে এখানকার মানুষের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। শেষে মোবাইল ফোনে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সব মিলিয়ে তারকেশ্বরের এই সভা শুধু একটা উদ্‌যাপন নয়, বরং বাংলার এক নতুন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল দিকটাকেই যেন তুলে ধরল।