ইন্দ্রজিৎ রায়: ভারতের সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিকে যাঁর তুলিতে শিল্পময় রূপ দেওয়া হয়েছিল, সেই কিংবদন্তি শিল্পী আচার্য নন্দলাল বসুর পরিবারকেই এবার ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। তাঁর নাতি ৮৮ বছর বয়সী সুপ্রবুদ্ধ সেন, তাঁর স্ত্রী দীপা সেন এবং গৃহসহায়িকার নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গিয়েছে, প্রথমে তাঁদের ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়। সাধারণত ভোটার পরিচয় বা বাসস্থান সংক্রান্ত অসঙ্গতি থাকলে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, যাচাইয়ের পরেও কোনও সুস্পষ্ট কারণ বা লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা শান্তিনিকেতনে বসবাস করেন এবং তাঁদের বাড়ি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন-এর বাড়ির কাছেই।

এই ঘটনার পর সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সুপ্রবুদ্ধ সেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি নতুন ভোটার তালিকায় নিজের নাম ‘ডিলিটেড’ দেখে বিস্মিত। কেন এমন হল তা জানেন না। তাঁর কথায়, তিনি তো জানেন তিনি এখানকার বাসিন্দা। তাহলে তাঁকে বাদ দেওয়া হল কেন? এর জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই দিতে পারবেন। তিনি আরও জানান, তাঁর বয়সের কারণে নির্বাচন দপ্তরের এক আধিকারিক কয়েকজনকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে এসে নথি যাচাই করে গিয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালের ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট দেখিয়েছেন। দীর্ঘ ৩২ বছর দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন-এ চাকরি করার তথ্যও দিয়েছেন, তবুও নাম বাদ পড়েছে। 

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমার মামাবাড়ির পরিচয় আমার মা যমুনা সেন। তাঁর বাবা হলেন আচার্য নন্দলাল বসু। তিনি কে তা আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, সুপ্রবুদ্ধবাবুর স্ত্রী দীপা সেন বলেন, সমস্ত নথি দেখানোর পরেও তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন তা কেউ জানায়নি। তাঁর কথায়, তাঁদের কাছে এর কোনও স্পষ্ট কারণ তুলে ধরা হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে তাঁর তেমন কিছু বলার নেই বলেও জানান তিনি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁদের প্রজন্মের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নতুন প্রজন্মের ভোটাধিকার। তাঁর মতে, তাঁদের ভোট না দিলেও চলবে, কিন্তু তাঁদের ছেলের মতো তরুণদের জন্য ভোটার কার্ড থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের দাবি, এটি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ। একদিকে ভিনরাজ্য থেকে ভুয়ো ভোটার অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ, অন্যদিকে বাংলার প্রকৃত বাসিন্দাদের নামই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া—এই দ্বৈত প্রবণতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে তারা। এই বিতর্কের মধ্যেই শান্তিনিকেতনের বুদ্ধিজীবী মহলেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। প্রবীণ আশ্রমিক, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষরা এই ঘটনাকে শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক অসম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সংবিধানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি পরিবারের সদস্যদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বীরভূম জেলা তৃণমূলের সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, প্রথমে অমর্ত্য সেন, আর এবার নন্দলাল বসুর পরিবার—এই ঘটনাগুলি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত বলেই মনে করছেন তিনি। তবে এই বিতর্কের মধ্যে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি নির্বাচন কমিশন। এখন নজর কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।