আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বাংলাদেশি সন্দেহে হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকায় শুক্রবারের পর শনিবার ফের একবার মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার বড়ুয়া মোড়ের কাছে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছে উত্তেজিত জনতা। এর পাশাপাশি শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় বেলডাঙার পাঁচড়া মোড়ে রেলগেটের কাছে ট্রেন অবরোধ করে রেখেছেন বিক্ষোভকারীরা। এর ফলে শনিবার ফের একবার উত্তর এবং দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যান চলাচল এবং শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
হাজারে হাজারে উত্তেজিত জনতা পুলিশের ‘গার্ড রেল’ এবং প্লাস্টিকের ‘রোড ডিভাইডার’ তুলে জাতীয় সড়কের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন উত্তেজনা ছড়িয়েছে তেমনই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ট্রেনে এবং বাসে করে নিজেদের গন্তব্যের দিকে যাত্রা করা বহু সাধারণ মানুষ। ইতিমধ্যেই পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং র্যাফের জওয়ানদেরকে নিয়ে ওই এলাকায় পৌঁছেছেন। তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেই স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। বেলডাঙায় শনিবার বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হতে হয়েছে বাংলার সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দের সাংবাদিক পার্থপ্রতিম ঘোষ এবং ক্যামেরাম্যান উজ্জ্বল ঘোষকে। শুক্রবারও বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হতে হয়েছিল সংবাদমাধ্যমকে। জি২৪ ঘণ্টার মহিলা সাংবাদিক সোমা মাইতি আক্রান্ত হন।
প্রসঙ্গত, ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলায় ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়ে আলাউদ্দিন শেখ নামে বেলডাঙা থানার সুজাপুর-তাতলাপাড়া গ্রামের এক যুবক দিন কয়েক আগে খুন হন বলে অভিযোগ। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় বেলডাঙার কাছে ট্রেন অবরোধ করে রাখে উত্তেজিত জনতা। এর পাশাপাশি অবরোধ করা হয় ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। পরে মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক নিতিন সিংহানিয়া এবং মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার সুপার কুমার সানি রাজ মৃতের পরিবারের এক সদস্যকে সরকারি চাকরি এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর পথ অবরোধ তোলেন উত্তেজিত জনতা।

রেল অবরোধের কারণে সারে সারে দাঁড়িয়ে ট্রেন। নিজস্ব চিত্র।
শনিবার সকালে ফের ওই এলাকার কাছে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর সম্প্রতি বিহারের ছাপড়া জেলায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়ে কয়েকজন যুবক আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে আনিসুর শেখ নামে এক যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় শুক্রবার বাড়ি ফিরে আসেন। শনিবার সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই যুবককে যখন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেই সময় উত্তেজিত জনতা নতুন করে বেলডাঙা থানার বড়ুয়া মোড়ে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। সূত্রের খবর ওই যুবকের বুকের পাঁজর ভেঙে গিয়েছে।
তাসির শেখ নামে বেলডাঙার কাটাগাছি এলাকার এক যুবক জানান, “গত কয়েক বছর ধরে বেলডাঙা থেকে আমরা ৪০-৫০ জন যুবক বিহারের ছাপড়া জেলার আমনৌর থানা এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করি। গত দু’দিন আগে বাঙালি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বলে আমাদের ৫-৭ জনকে সেখানকার লোকজন প্রচণ্ড মারধর করেন। প্রাণভয়ে আমরা কোনও রকমে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি।”

তাঁর আরও অভিযোগ, ”আমাদের কাছে আধার কার্ড, প্যান কার্ড সবই ছিল। তা দেখানোর পরও বাঙালি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বলে আমাদেরকে মারধর করা হয়েছে। আমাদের যাবতীয় নথি দেখালেও সেগুলি বিহারের লোকজন ছিঁড়ে ফেলেছে।”
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, আনিসুর নামে যে যুবককে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে তাঁর বাড়ি বেলডাঙা থানার মধ্যমপুর এলাকায়। তিনি বিহারের হাজিপুরে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন।
রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভরত পরিযায়ী শ্রমিকরা বলেন, “রাজ্য সরকারের তরফ থেকে মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে এবং একটি চাকরি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যে পরিবারের সদস্য চলে যাচ্ছে তাঁদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তার দায় কে নেবে? ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভিনরাজ্যে কাজ করতে গেলে আমাদের পরিচয়পত্র ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে। মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন পরিযায়ী শ্রমিকদেরকে যে পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে সমস্ত শ্রমিকের নিজের নাম লেখা থাকবে। ভিনরাজ্যে কাজ করতে গেলে বাংলায় কথা বললে এবং মুসলিম পদবি দেখলেই আমাদের মারধর করা হচ্ছে। আমরা এর থেকে মুক্তি চাইছি। ভিনরাজ্যের লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গে শান্তিতে কাজ করছেন। তাহলে আমরা কেন অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেলে আক্রান্ত হব?
ঝাড়খণ্ডে আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর ঘটনা জেরে শুক্রবার বেলডাঙায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার রাতেই মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে ভিনরাজ্যে গিয়ে কোনও বিপদে পড়লে পরিযায়ী শ্রমিকদেরকে সাহায্য করার জন্য জন্য তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁদেরকে আইনগত পরামর্শ দেওয়ার জন্য এটি ‘লিগাল সেল’ও চালু করেছে মুর্শিদাবাদ প্রশাসন।
