আজকাল ওয়েবডেস্ক: ছেলে ধরা গুজবের জেরে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ নিরীহ মানুষকে মারধরের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি ছেলে ধরা গুজবে মুর্শিদাবাদের লালগোলা থানার দেওয়ানসরাই গ্রাম পঞ্চায়েতের সীতেশনগরে এক যুবক-যুবতীকে প্রচন্ড মারধর করে তাঁদের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো হিংসাত্মক একটি ঘটনা ঘটে। 

এরপর এই গুজব বন্ধ করতে এবং নিজের হাতে আইন তুলে না নেওয়ার জন্য পুলিশের তরফ থেকে বিভিন্ন থানা এলাকায় প্রচার চালানো হলেও তাতে যে খুব একটা কাজ হয়নি তা ফের একবার প্রমাণ হয়ে গেল।
 
মঙ্গলবার রাতে মুর্শিদাবাদের নওদা থানা এলাকার বালি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের শ্যামনগর বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তিকে ছেলে ধরা সন্দেহে ব্যাপক মারধর করার অভিযোগ উঠল স্থানীয় উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে। ঘটনার খবর পেয়ে নওদা থানার পুলিশ এলাকায় পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। যদি ওই ঘটনায় এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি বলেই জানা গিয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবককে শ্যামনগর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেন কিছু মানুষ। এরপরই গুজব রটে যায় ওই ব্যক্তি এলাকা থেকে এক শিশুকে চুরি করে পালানোর চেষ্টা করছে। এই গুজবের জেরে উন্মত্ত জনতা ওই ব্যক্তিকে  বিদ্যুতের খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে বেশ কিছুক্ষণ মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

অভিযোগ উঠেছে ওই ব্যক্তিকে নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে সে সঠিকভাবে উত্তর দিতে না পারায় এলাকাবাসীর সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় যে সে বাচ্চা চুরি করার জন্যই ওই এলাকায় হাজির হয়েছে। যদিও নওদা থানার পুলিশ এলাকায় গিয়ে তদন্ত শুরু করার পরেই বোঝা যায় ওই ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন এবং অন্য কোনও জায়গা থেকে ঘুরতে ঘুরতে নওদার শ্যামনগরে পৌঁছে গিয়েছে।  এরপর পুলিশি হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তি ছাড়া পান। 

অন্যদিকে অপর একটি ঘটনায়  বেলডাঙা থানা সুরুলিয়া এলাকায় এক মহিলাকে মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় জনতা ব্যাপক মারধর করে। অভিযোগ উঠেছে ওই মহিলা নাকি  বিস্কুট খাইয়ে এলাকারই এক বাচ্চাকে চুরি করার চেষ্টা করছিল। স্থানীয় জনগণ 'ছেলে ধরা' সন্দেহে ওই মহিলাকে হেনস্থা করে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও পরবর্তীকালে ওই মহিলার ব্যাগ থেকে  বিস্কুটের পরিবর্তে কিছু পান মশলা উদ্ধার হয়। 

ছেলে ধরা গুজবে এক ব্যক্তিকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে  হরিহরপাড়া থানার লোচনমাটি-ডাঙ্গাপাড়া এলাকাতেও। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার রাতে কেউ বা কারা রটিয়ে দেয় এলাকার  বাচ্চাদের চুরি করার জন্য একটি দল লোচনমাটি-ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে ঢুকেছে। এর পরই উত্তেজিত জনতা কয়েকজনকে আটকে রেখে হেনস্থা করে বলে অভিযোগ। যদিও ওই এলাকা থেকে কোনও বাচ্চা চুরির খবর পরবর্তীকালে পাওয়া যায়নি। 

সোমবার রাতে ছেলেধরা গুজবে উত্তাল হয়ে উঠে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা থানার তিলডাঙ্গা এলাকাও। ঝাড়খন্ড সীমান্তবর্তী এই এলাকায় সোমবার রাতে গুজব রটে যায় কেউ বা কারা এলাকা থেকে কয়েকটি বাচ্চাকে চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে। এরপর হাজার হাজার গ্রামবাসী তিলডাঙ্গার মাঠ ঘিরে ফেলে। পরবর্তীকালে সেই মাঠ থেকে এক প্রাপ্তবয়স্ক যুগলকে উদ্ধার করা হয়। কোনও ছেলেধারা বা নিখোঁজ বাচ্চার সন্ধান সেই মাঠে পাওয়া যায়নি। 

জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, গত কয়েকদিন ধরে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন থানা এলাকায়  উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছেলে ধরা গুজবে কিছু মানুষকে হেনস্থা করা হয়েছে।  প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার আবেদন করা হচ্ছে  কেউ আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবেন না। কাউকে বেআইনি কাজ করতে দেখলে বা সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দিন। পুলিশ  যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। ইতিমধ্যেই এই মর্মে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে বিভিন্ন থানা এলাকায় মাইকে প্রচারও শুরু হয়ে গিয়েছে। 

পুলিশের ওই আধিকারিক জানান, আমাদের অনুমান রমজান মাস চলার জন্য বিভিন্ন এলাকায় বাইরের থেকে প্রচুর মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করতে আসছেন। অপরিচিত লোকেদের গ্রামের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে দেখার জন্যই এই গুজব কেউ বা কারা ইচ্ছাকৃতভাবে রটিয়ে দিচ্ছে। পুলিশের তরফ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে গুজব ছড়িয়ে কাউকে মারধর করা হলে পুলিশ প্রশাসন কড়া হাতে তার ব্যবস্থা নেবে।

প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গুজবে জেরে একাধিক গণপ্রহারের ঘটনা ঘটেছে। কেশিয়াড়ি এলাকার খাজরা পঞ্চায়েতের গিলাগেড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সৌম্যদীপ নামে এক ইঞ্জিনিয়ারকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার সময় চোর সন্দেহে আটকে ব্যাপক মারধর করা হয়। টানা ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর গত ২০ তারিখ মৃত্যু হয় ওই ইঞ্জিনিয়ার যুবকের। সেই ঘটনার রেশ কাটার আগেই গত ২৪ তারিখ খড়্গপুরে পাঁচপাড়া গ্রামে চোর সন্দেহে এক যুবককে প্রচন্ড মারধর করা হয়।