রিয়া পাত্র
পদ এক। প্রতিপক্ষ অনেক। এক বছর, দু'বছর, তিন বছর। মুখে সামনাসামনি হেসে-খেলে, কিছু না বলে কাটিয়ে দিলেও, রাজনীতি সচেতন মানুষেরা বলে থাকেন, তাঁরা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের 'মাথা' হতে চেয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, মুখোমুখি। এবার সেই দুই প্রতিপক্ষকে, একেবারে হাত ধরে, পাশাপাশি বসিয়ে, কার্যত খেলা ঘুরিয়ে দিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জি। এক লক্ষ্য যদি হয় কালীঘাট তৃণমূলকে ক্রমে আরও দুর্বল করা, অবশ্যই দ্বিতীয় লক্ষ্য, নানাজনের ভিতরে যে ঠান্ডা লড়াই ক্রমেই ছাত্র সংগঠনের ভিত আলগা করছিল, সেই লড়াইয়ের গোড়া কেটে দেওয়া।
অবিভক্ত তৃণমূলের দুই ছাত্র নেতা। কোহিনূর মজুমদার। সুদীপ রাহা। কোহিনূরকে অবশ্যই, তৃণমূল ভেঙে যাওয়ার আগেই, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য চিঠি দিয়ে দল থেকে নিলম্বিত করেছিলেন। কালীঘাট পন্থী সেই চন্দ্রিমাও এখন ঋতব্রতর শিবিরে। কোহিনূরও। এই কোহিনূর ছাত্রনেতা হলেও, তৃণমূল ভাঙার আগে পর্যন্ত তিনি মূলত অরূপ বিশ্বাস আর কুণাল ঘোষ ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে সুদীপ রাহা ছিলেন অভিষেক ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। লক্ষ্য, তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের সভাপতির পদ, দু'জনেই আবার কোথাও গিয়ে তৃণাঙ্কুর বিরোধী বলেও পরিচিত ছিলেন। তৃণমূল ভেঙে যাওয়ার পরেও সুদীপকে চদেখা গিয়েছিল, মমতা ব্যানার্জির ধর্মতলার অবস্থান স্থলে। অনেকেই আশা করেছিলেন, টিকিট পেয়ে হেরে গিয়ে তৃণাঙ্কুর যেভাবে চুপ করে গিয়েছেন, তাতে এবার শিকে ছিঁড়বে সুদীপের ভাগ্যে। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম। কালীঘাট শিবিরের ঠিক করা, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি হয়েছেন প্রিয়াঙ্কা অধিকারী। তারপর? তারপর বৈঠক হয়েছে। হয়েছে সাক্ষাৎ। অতঃপর দু'জনেই ঋতব্রত শিবিরে। পেলেন ছাত্রপরিষদের পদও। সুদীপ অপেক্ষার খরা কাটিয়ে ঋতব্রত শিবিরের গড়া কমিটি অনুযায়ী, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি সুদীপ রাহা। কোহিনূর চেয়ারম্যান। দু'জনেই আবার মুখপাত্রও।
অর্থাৎ ঠান্ডা লড়াই, গোপন 'আদায়-কাঁচকলায়' সম্পর্ক চুকিয়ে এবার হাতে হাত দিয়ে কাজ? পদ পেয়ে কী বলছেন কোহিনূর? বলছেন, ঋতব্রত শিবিরে তাঁর আসার অন্যতম মূল কারণ 'কালেকটিভ লিডারশিপ' তত্ত্ব। তাঁর মতে, মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র দিনে দিনে সরে যাচ্ছিল অভিষেক ব্যানার্জির দিকে। একজনের কথা, একজনের মত সর্বস্ব হয়ে উঠছিল সবকিছু। অভিষেক ব্যানার্জির আচরণকে 'জমিদারি আচরণ' বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। কোহিনূর আগেও তুমুল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিষেককে নিয়ে, সেই কারণেই নিলম্বিত হওয়ার খারা নেমে আসে। এখনও সেই ক্ষোভ স্পষ্ট। একই সঙ্গে এক সময়ের 'প্রতিপক্ষ'-এর পদ প্রাপ্তিতে তিনি খুশিই।
অন্যদিকে সুদীপ কী বলছেন? কালীঘাট শিবিরকে তীব্র কটাক্ষ করে তাঁর বক্তব্য, 'বেইমান-বিশ্বাসঘাতক না বলে, তাঁরা এবার আত্মসমীক্ষা করুন। তাতে এই জায়গা থেকে উত্তরণ ঘটবে।' দল যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করবে, একশ শতাংশ দিয়ে, তা নিয়ে যেমন সাফ বার্তা সুদীপের, একইসঙ্গে বার্তা, 'আমরা কোনও শিবির বদলাইনি। আমরা তৃণমূল কংগ্রেসে ছিলাম, আছি, থাকব।' শিবির বদলের আগে কি অভিষেকের সঙ্গে কথা বললেন সুদীপ? সেখানেও তাঁর বক্তব্য, 'আমরা সকলেই একটি দলের অংশ। মমতা ব্যানার্জি আমার কাছে চিরকাল শ্রদ্ধার। তিনি আমাদের আগের মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেত্রী। আমরা তো চাই, তিনি আমাদের উপদেশ দিন, পরামর্শ দিন। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। ব্যক্তি সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে, আমাদের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত মানতে হবে।' মূলত নাম না করে, সুদীপের গলাতেও ক্ষোভ অভিষেক ব্যানার্জিকে নিয়ে। ক্ষোভের জায়গা এক, কাজের জায়গাও এক। এবার হাত মিলিয়ে কাজ করবেন সুদীপ-কোহিনূর?















