আজকাল ওয়েবডেস্ক: ট্রেনের ধাক্কায় ফের হাতির মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়াল ধুপগুড়ি ব্লকের খলাইগ্রাম এলাকাতে। ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার ভোর চারটে নাগাদ। খলাইগ্রাম রেলস্টেশন সংলগ্ন নাওয়াপাড়া ৭৩/৭ নম্বর পিলারের ঘটনাটি ঘটে।
রেল সূত্রের খবর, একটি ডাউন লাইনের মালগাড়ির ধাক্কায় দু'টি হাতি আহত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত দু'দিন থেকে এই এলাকাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল প্রায় চারটি হাতির একটি দল। আচমকা এদিন সকালে হাতির দলটি রেল লাইন পেরোনোর সময় হঠাৎই ডাউন লাইনে ওই মালগাড়ির ধাক্কায় লাইন থেকে ছিটকে পড়ে দু'টি হাতি।
দলে থাকা হাতি দু'টি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও, লাইনের পাশে থাকা আহত হাতি প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পাশেই পড়ে রয়েছে। এবং অপর একটি হাতি গুরুতর অবস্থায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে পড়ে এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন ধুপগুড়ি থানার পুলিশ সহ রেলের আধিকারিকরা। সেইসঙ্গে বন দপ্তরের কর্মীরাও ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। হাতি দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে।
২০২৩ সালে নভেম্বরে শিলিগুড়ি থেকে ডুয়ার্স হয়ে আলিপুরদুয়ার-গামী রেল পথে ট্রেনের ধাক্কায় আবারও তিনটি হাতির মৃত্যু হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল রাজাভাতখাওয়ার শিকারি গেট এলাকায়। জানা গিয়েছিল, সোমবার সকাল প্রায় ৭টা ২০ নাগাদ রেল লাইন পেরোনোর সময় শিলিগুড়িগামী একটি মালগাড়ি হাতি গুলিকে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনাস্থলেই শাবক সহ ৩টি হাতির মৃত্যু হয়৷ ধাক্কা লাগার পর ট্রেনটি সেখানেই দাঁড়িয়ে যায়, দেখা যায় রেল লাইনের ধারে পড়ে রয়েছে একটি পূর্ণবয়স্ক ও একটি সাব-অ্যাডাল্ট হাতির দেহ।
দুর্ঘটনার তীব্রতায় রেলের বগির তলে আটকে যায় একটি হস্তিশাবকের মৃতদেহ। এর পরই এই লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছন বনদপ্তর ও রেল দপ্তরের আধিকারিকেরা। তাঁরা মৃতদেহগুলি সড়িয়ে রেল চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।
হাতির মৃত্যুর জন্য এই রেল লাইনটি কুখ্যাত। হাতি ছাড়াও এই পথে রেলের ধাক্কায় চিতাবাঘ, বাইসন, অজগর, হরিণ, শকুন সহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে।
মিটার গেজ থাকাকালীন শিলিগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ারগামী এই রুটে ১৯৭৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ২৭ টি হাতির মৃত্যু হয়। গেজ পরিবর্তনের পর ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৪৩ টি হাতি, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৩০ টি হাতির মৃত্যু হয়। ২০১০ সালে ২৩ শে সেপ্টেম্বর মোরাঘাট এলাকাতেই ট্রেনের ধাক্কায় ৭টি হাতির মৃত্যুর পর ডুয়ার্সের হাতি চলাচলের পথগুলি এবং জঙ্গলের ভেতর রেলের গতিবেগ কমিয়ে ২৫ কিলোমিটার বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এর পরও ২০১৩ সালের ৩১ মে ওই একই জায়গায় আবারও ট্রেনের ধাক্কায় তিনটি হাতি ও ৩০ জুন ২০১৯ সালে একটি হাতির মৃত্যু ঘটে। ২০১৫-১৬ সালে ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যুর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় পাঁচটিতে। পরবর্তীতে ২০১৬-১৭ সালে তিনটি এবং ২০১৭-১৮ সালে রেলের ধাক্কায় দুটি হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। বিগত ১০ই আগস্ট নাগরাকাটা ও চালসা স্টেশানের মাঝে চাপরামারি জঙ্গলে ট্রেনের ধাক্কায় একটি গর্ভবতী হাতির মৃত্যু হয়।
এই রেল পথে রেল লাইনে হাতিদের উঠে আসা কিম্বা হাতির লাইন পারাপার করার সময় নিরাপদ দূরত্বে ট্রেন থামিয়ে দেওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেল দপ্তরের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা এড়ানোর এমন ছবি ও ভিডিও নিয়মিত প্রচারও করা হয়। তবে এদিন কেন ট্রেনটিকে নিরাপদ দূরত্বে থামানো গেল না? ট্রেনটি কি অধিক গতিতে ছুটছিল নাকি রেল লাইনের আশেপাশে হাতির দল থাকার খবর ড্রাইভারের কাছে ছিল না? এই সব প্রশ্নই দুর্ঘটনার পর উঠতে শুরু করেছে।
হাতির মৃত্যু রোধে রেল লাইনে লাগানো হয়েছিল "আর্লি অ্যালার্মিং সিস্টেম"। রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল - রেল লাইনে লাগানো অপ্টিক্যাল ফাইভার নির্ভর "অটোমেটেড এলিফ্যান্ট ট্রাকিং ডিভাইস" বা "ইনট্রুশান ডিটেকশান সিস্টেম" ডুয়ার্সের প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল লাইনের দুই পাশের ১০ মিটারের মধ্যে হাতি চলে এলে তা শনাক্ত করে ফেলবে, সেই বার্তা পৌঁছে যাবে স্টেশন মাস্টার হয়ে রেলের চালকের কাছে। এই এলাকায় কি সেই সুরক্ষা ব্যবস্থা লাগানো ছিল না? নাকি তা সঠিক ভাবে কাজ করেনি? দুর্ঘটনায় এই ব্যবস্থার কার্যকরীতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
