আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভাঙন ধরেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে, আর এবার দলের শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং দলবিরোধী কাজে মদত দেওয়ার অভিযোগে নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করল জোড়াফুল শিবিরের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি। কোনো সাধারণ স্তরের কর্মী নয়, সরাসরি দলের শীর্ষ স্তরের একঝাঁক হেভিওয়েট মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাকে একযোগে ‘শোকজ’ করা হয়েছে। দলবিরোধী কাজের অভিযোগে একসঙ্গে এতজন শীর্ষ নেতাকে শোকজ করার এই ঘটনা তৃণমূলের ইতিহাসে কার্যত বিরল এবং এর ফলে রাজ্য রাজনীতিতে এক লহমায় পারদ চড়েছে।

তৃণমূলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে পাঠানো এই কড়া চিঠির তালিকায় রয়েছেন কলকাতার মেয়র তথা প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (ববি), প্রাক্তন বিদ্যুৎ ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়, কসবায় বর্ষীয়ান বিধায়ক তথা প্রাক্তন বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী জাভেদ খান। এছাড়াও রয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার হেভিওয়েট নেতা রথীন ঘোষ, দক্ষিণ দিনাজপুরের বিপ্লব মিত্র, হুগলির দাপুটে নেতা স্নেহাশিস চক্রবর্তী এবং মালদহের নেত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে অভিযোগ, এই নেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং পরিকল্পনা করে দলের নির্দেশ অমান্য করেছেন, অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকোন্দলে ইন্ধন দিয়েছেন এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার মতো গুরুতর দলবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

এই চরম সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে নিউটাউনের নোভোটেল হোটেলে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সেখানে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের প্রতিনিধিরা পাহাড় থেকে সাগর— বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকেন। সেখানে ঋতব্রত ব্যানার্জি তরফে দাবি করা হয়, ২০২২ সালে গঠিত তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালেই শেষ হয়ে গেছে, তাই বর্তমান কমিটির কোনো বৈধতা নেই। এই বিশেষ অধিবেশনে ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জিকে সরিয়ে দলের নতুন সর্বভারতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় অরূপ রায়ের নাম।

নতুন এই ‘তৃণমূল’-এর সাংগঠনিক কাঠামোয় একঝাঁক চেনা মুখকে বড় দায়িত্বে আনা হয়েছে, যা বিদায়ী বা মূল শিবিরের জন্য চরম অস্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নতুন কমিটির সহ-সভাপতি পদে রাখা হয়েছে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ ও সাবিনা ইয়াসমিনকে। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে খোদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান ও সন্দীপন সাহাকে। কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন আখরুজ্জামান আনসারি। ঋতব্রত ব্যানার্জি সাফ জানিয়েছেন, এই সমস্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দেওয়া হবে এবং তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে কমিশনের দ্বারস্থ হবেন। তাঁর মতে, মমতা ব্যানার্জি যদি চান তবে কেবল পরামর্শদাতা বা ‘মার্গদর্শক’ হিসেবে থাকতে পারেন।

বিক্ষুব্ধ শিবিরের এই বিদ্রোহের পাল্টা হিসেবেই এবার কোমর বেঁধে নেমেছে মূল দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি এবং একযোগে এই হেভিওয়েটদের শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। একদিকে নতুন কমিটির পদ পাওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে মূল দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কড়া চিঠি— সব মিলিয়ে জোড়াফুল শিবিরের অন্দরের এই তোলপাড় শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে রূপ নিতে চলেছে। নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত ঋতব্রতর দাবি নাকি মমতার কমিটিকে বৈধতা দেয়, এখন সেটাই দেখার।