আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডায়মন্ড হারবার:রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম জেলা সফরেই প্রশাসনিক কড়াকড়ির স্পষ্ট বার্তা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার তাঁর জেলা সফর শুরু হল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডায়মন্ড হারবার থেকে, যা দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষত, এই এলাকা অভিষেক ব্যানার্জি লোকসভা কেন্দ্র হওয়ায় প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে এই সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

শনিবার সকালে ডায়মন্ড হারবারে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি যান সরকারি পর্যটন আবাস ‘সাগরিকা’-য়। সেখানেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রশাসনিক শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলার জেলাশাসক, ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার, বিভিন্ন মহকুমার আধিকারিক এবং জেলার সমস্ত থানার পুলিশ আধিকারিকরা। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়ালও।

প্রশাসনিক সূত্রে খবর, এই বৈঠকের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোট-পরবর্তী হিংসা, সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুপ্রবেশ, বেআইনি ব্যবসা রোধ এবং সরকারি পরিষেবার গতি বৃদ্ধি। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সন্ত্রাস এবং ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলা নিয়ে বিরোধীদের তরফে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক আধিকারিকদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে শুনতে হবে। তাঁর কথায়, “পুলিশ সব স্তরের মানুষের জন্য। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।” তিনি ইঙ্গিত দেন, অতীতে প্রশাসনের একাংশ বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু নতুন প্রশাসনে সেই পরিস্থিতি বরদাস্ত করা হবে না।

মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে পুলিশ ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ও জনমুখী করার উপর জোর দেন। জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া পুলিশ কল্যাণ পর্ষদকে ফের সক্রিয় করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পুলিশ কর্মীদের কাজের পরিবেশ, মানসিক চাপ এবং পরিবার সংক্রান্ত সুবিধার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে বৈঠকে। প্রশাসনের মতে, পুলিশ বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে হলে তাদের কল্যাণমূলক বিষয়গুলিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এ দিনের বৈঠকে অবৈধ বালি খাদান ও অবৈধ কয়লা পাচার নিয়েও কড়া অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন জেলা থেকে বেআইনি খনন ও পরিবহণের অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। প্রশাসনিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, বেআইনি বালি খাদান, কয়লা চক্র বা প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই ধরনের বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে প্রশাসনের কোনও ব্যক্তি যুক্ত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন তিনি।

শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জেলার হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা পরিষেবার মান, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলিতে জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।

এ দিনের সফরে রাজনৈতিক ঘটনাও নজর কেড়েছে। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের সাক্ষাৎ হয়নি বলে জানা গিয়েছে। পরে তিনি সেখান থেকে ফিরে যান। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

উল্লেখযোগ্যভাবে, শুক্রবার বিধানসভায় ডায়মন্ড হারবার ও সংলগ্ন এলাকায় ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন স্থানীয় বিধায়ক পান্নালাল হালদার। সেই ঘটনার পরের দিনই মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। সূত্রের খবর, ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম জেলা সফর এবং তার সূচনা ডায়মন্ড হারবার থেকে হওয়া নিছক প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়, বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগে আলোচিত এলাকায় সরাসরি প্রশাসনিক বৈঠক করে তিনি একদিকে যেমন প্রশাসনের উপর কড়া নজরদারির বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শূন্য সহনশীলতা নীতিরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

প্রশাসনিক বৈঠক শেষে শনিবার বিকেলে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডার সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা করার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। ফলে প্রশাসনিক বৈঠকের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও দিনটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন দেখার, ডায়মন্ড হারবার মডেল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া অবস্থানের পর প্রশাসনিক স্তরে কতটা পরিবর্তন আসে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তার কী প্রভাব পড়ে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক সমীকরণেও এই সফর ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।