আজকাল ওয়েবডেস্ক: মাত্র কয়েক বছর আগেও পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম–গুসকরা অঞ্চলে সিপিএমের এমন দাপট ছিল যে, কথায় কথায় বলা হত ‘গরু আর শেয়াল এক ঘাটের জল খায়’। সেই সিপিএমই আজ নিজেদের তৈরি পার্টি অফিস ভাড়াটিয়ার দখলমুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। গুসকরা শহরের তিনতলা পার্টি অফিস ‘রবীন সেন ভবন’ ফেরত না পাওয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা ও বিতর্ক।

ঘটনাস্থল গুসকরা শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লজপাড়া এলাকা। ১৯৯৯ সালের মে মাসে প্রাক্তন মন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরীর হাত ধরে উদ্বোধন হয়েছিল এই ভবনের। দীর্ঘদিন ধরে এখান থেকেই গুসকরা শহরে সিপিএমের সাংগঠনিক কাজকর্ম পরিচালিত হত। কিন্তু ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে দলের সংগঠন। সঙ্গে বাড়ে আর্থিক সংকট।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সেই আর্থিক চাপ সামলাতেই ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে গুসকরার বাসিন্দা ও পেশায় প্রোমোটার স্বপন পালকে চুক্তি অনুযায়ী বছরে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় ভবনটি লিজ দেওয়া হয়। অভিযোগ, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভাড়াটিয়া ভবনটি দলের হাতে ফেরত দেয়নি। সেই থেকেই শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।

গুসকরা শহর সিপিএমের এরিয়া কমিটির সম্পাদক ইরফান শেখ জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভাড়াটিয়াকে ভবন খালি করার কথা জানানো হয়েছিল। দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় লিজ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর কথায়, “আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভবন খালি করে বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তা না হলে দল পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।”

অন্যদিকে ভাড়াটিয়া স্বপন পাল দাবি করেন, তিনি একাধিকবার দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিজ নবীকরণের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, লিজ নবীকরণ হলে তিনি বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে দিতে এবং ভবিষ্যতেও নিয়মমাফিক ভাড়া দিতে প্রস্তুত। চুক্তির মেয়াদকালে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করেছেন বলেও তাঁর দাবি, যার রসিদ তাঁর কাছে রয়েছে।

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ক্ষমতা হারানোর পর শহরের একাধিক জায়গায় পার্টি অফিস বজায় রাখার খরচ মেটাতেই এই ভবন ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তই এখন সিপিএম নেতৃত্বের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করে সিপিএমকে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল নেতা বাগবুল ইসলাম বলেন, “সিপিএম পুঁজি বোঝে বলেই পার্টি অফিস ভাড়া দিয়েছিল। এখন সেই পুঁজির খেলাতেই তারা আটকে গেছে। ওদের সংগঠন দুর্বল, লোক নেই। তবে যদি সিপিএম আমাদের সহযোগিতা চায়, পৌরসভার তরফে বিষয়টি দেখা যেতে পারে।”

একসময় গুসকরা ছিল বামেদের দুর্ভেদ্য দুর্গ। আজও সংগঠন পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি—মহবুব জাহেদী, সমর বাওরা, সৈয়দ মহম্মদ মসীহর মতো নেতারা এলাকায় সক্রিয়। তবুও বাস্তবতা বদলেছে। যে দল একসময় প্রশাসন ও সমাজে প্রভাব বিস্তার করত, সেই দলকেই আজ নিজেদের ঘর বাঁচাতে অন্যের সাহায্যের কথা ভাবতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, গুসকরার এই পার্টি অফিস দখল বিতর্ক শুধু একটি ভবনের প্রশ্ন নয়—এটি রাজ্যের বাম রাজনীতির উত্থান-পতনের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। সত্যিই যেন প্রবাদটি আবার মনে পড়ে যায়- ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়!’