মিল্টন সেন: প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বলাগড়ের নৌকা শিল্প এবার জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতি পাওয়ার দোরগোড়ায়। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই এই সুখবর আসতে পারে বলে আশাবাদী শিল্পী ও গবেষকরা।
এতে নতুন করে হুগলি জেলার গৌরব বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বলাগড় বহুদিন ধরেই ডিঙি নৌকা তৈরির জন্য পরিচিত।
একসময় এখানে শুধুমাত্র ডিঙি নৌকাই তৈরি হতো। এই নৌকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কোনও পেরেক ছাড়াই নৌকা তৈরি করা। বিশেষ কৌশলে একটি কাঠের সঙ্গে অন্য কাঠ জুড়ে নৌকা বানানো হত, যা নৌশিল্পীদের ভাষায় ‘জোড় কাঠ পদ্ধতি’ নামে পরিচিত। বর্তমানে পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসে পেরেক ব্যবহার করা হলেও ঐতিহ্যের ছাপ এখনও অটুট।
আজও বহু পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে আগে প্রায় ৪০টি পরিবার এই পেশার যুক্ত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২০-তে দাঁড়িয়েছে।
নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, কম মজুরি, চাহিদা হ্রাস এবং পরিবহণ সমস্যার কারণে শিল্পটি ধীরে ধীরে সংকটে পড়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
একসময় সুন্দরবন, নামখানা, কাকদ্বীপ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়মিত নৌকা তৈরির বরাত আসত বলাগড়ে। বর্তমানে সেই অর্ডারের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। অর্ডার না থাকায় হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পীই এখন এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
শিল্পীদের আশা, জিআই স্বীকৃতি পেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি বাড়বে, বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং বিক্রি বাড়বে।
একসময় বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা ও তেতুলিয়া এলাকায় একাধিক নৌকার কারখানা ছিল যার কিছুটা এখনও টিকে আছে।
বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, ২০২৩ সালে জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়, যার প্রস্তুতি শুরু হয় ২০২২ সাল থেকে। প্রায় এক বছর ধরে শুনানি চলে।
আবেদনপত্র জমা দেন ড. পিনাকী ঘোষ এবং গবেষণায় সহায়তা করেন বিজয় কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
ইতিমধ্যেই নৌশিল্পীদের সমবায় গঠন করা হয়েছে এবং জিআই ট্যাগ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও হয়নি, তবে এপ্রিল মাসেই তা আসতে পারে বলে আশাবাদী সকলে।
প্রাচীন এই শিল্পে আগে বাবলা বা শাল কাঠ ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন সেই কাঠেরও অভাব দেখা দিয়েছে। শিল্পীরা মনে করছেন, জিআই তকমা পেলে নতুন বাজার তৈরি হবে এবং বিভিন্ন রাজ্যে নৌকা রপ্তানি করা সম্ভব হবে। মাছ ধরার পাশাপাশি পর্যটন ক্ষেত্রেও এই নৌকা ব্যবহার করা যেতে পারে।
নৌশিল্পী সঞ্জয় প্রামাণিক ও কালীপদ বারিক বলেন, ‘জিআই স্বীকৃতি পেলে নৌকার বিক্রি বাড়বে এবং শিল্পীরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।’
অন্যদিকে নৌ-শিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন জানান, জিআই-এর প্রভাব সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও পরিচিতি বাড়লে নতুন ক্রেতা ও বাজার তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
