আজকাল ওয়েবডেস্ক: তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির উপর হামলার ঘটনায় জোরদার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। সোনারপুরের কামরাবাদে শনিবার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই ছয় জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাতভর তল্লাশি চালিয়ে ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে ধরপাকড় শুরু হয়। রবিবার ধৃতদের বারুইপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে পুলিশ ১৪ দিনের হেফাজতের আবেদন জানায়। যদিও বিচারক অভিযুক্তদের একদিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
শনিবার বিকেলে সোনারপুরের কামরাবাদ এলাকায় এক মৃত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি। অভিযোগ, সেই সময় আচমকাই একদল উত্তেজিত মানুষ তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, অভিষেককে ঘিরে ধাক্কাধাক্কি, জামা টেনে ধরা এবং শারীরিক হেনস্থার ঘটনাও ঘটে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরই তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। সোনারপুর থানার পুলিশ রাতভর এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালায়। স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং সাধারণ মানুষের মোবাইলে ধরা পড়া দৃশ্য খতিয়ে দেখে একে একে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আকাশ গায়েন, কাজল দাস, দেবাশিস দত্ত, নির্মাল্য সেনগুপ্ত, তপন মাইতি-সহ মোট ছয় জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতরা সকলেই রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বাসিন্দা।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে অভিযুক্তরা অভিষেক ব্যানার্জিকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি শারীরিকভাবে হেনস্থাও করছেন। বিশেষ করে ধৃত আকাশ গায়েনকে প্রথম হামলাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। জানা গিয়েছে, তিনি মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফলে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিশেষভাবে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার নেপথ্যের কারণ জানার চেষ্টা চলছে।
যদিও রবিবার সকাল পর্যন্ত অভিষেক ব্যানার্জি বা তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, তবুও ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করেছে সোনারপুর থানার পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, এই হামলা শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল, নাকি এর পিছনে কোনও পূর্বপরিকল্পনা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বৃহত্তর কোনও ষড়যন্ত্র জড়িত রয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ধৃতদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, যোগাযোগের তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কার্যকলাপও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে তদন্তে উঠে এসেছে, গ্রেপ্তার হওয়া কয়েক জন একসময় সোনারপুর দক্ষিণের প্রাক্তন বিধায়ক লাভলি মৈত্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি তাঁরা দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী হিসেবেও পরিচিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে।
ফলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা। বিরোধীদের একাংশ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, যদি শীর্ষ নেতাই নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত।
ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতার সফরে নিরাপত্তায় কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বারুইপুর পুলিশ জেলার কর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনিক স্তরে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে একাধিক ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তদন্তের স্বার্থে সেই ফুটেজ ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানও রেকর্ড করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে, অভিষেক ব্যানার্জির উপর হামলার এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে অভিযুক্তদের একাংশের তৃণমূল ঘনিষ্ঠ পরিচয় সামনে আসায় শাসকদলের অন্দরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এখন তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং ধৃতদের জেরায় নতুন কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।















