আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সব ঠিকঠাক থাকলে, আগামী জুলাই মাস থেকেই উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে বাইগাছি প্লান্টে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন শুরু হতে পারে খনিজ তেলের। পরবর্তীতে প্রাকৃতিক গ্যাসেও বাণিজ্যিক উত্তোলনের লক্ষ্য মাত্রা নেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ওএনজিসির তরফে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে অশোকনগর তথা উত্তর ২৪ পরগনা জেলা, পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের জ্বালানি মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে। ওএনজিসির তরফ থেকে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও করা হবে বলে জানিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য। 

ওএনজিসি প্রকল্পে কাজ করা কর্মীদের সূত্রে খবর, অশোকনগরে মোট সাতটি কূপ খনন করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বাইগাছি কেন্দ্রের একটি কূপ থেকে জুলাই মাসেই তেল উৎপাদন শুরু হতে পারে। অশোকনগর বিধানসভা এলাকার ভুরকুন্ডা দৌলতপুর-সহ বাকি খনিজ তেলের কূপগুলিতেও কাজ চলছে পরবর্তীতে সেখান থেকেও তেল তোলা হবে। দীর্ঘ বছর ধরে আইনি জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের গড়িমসিকেই দায়ী করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের পর ওএনজিসি প্রকল্প নিয়ে অগ্রগতিতে রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। সংসদে বিষয়টি বারবার উত্থাপন করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গেও ধারাবাহিক ভাবে যোগাযোগ রেখে প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তেলের মান বম্বে হাইয়ের সমতুল। ওএনজিসি ও এক সহযোগী তেল সংস্থা মিলে এই প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকা লগ্নি করেছে। 

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে অশোকনগরের এই বাইগাছি কেন্দ্রের কূপ থেকে প্রায় ৩৭৫ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়েছে, যার গুণমান ভারতের সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদনকারী বম্বে হাই-এর চেয়েও ভাল বলে জানা গিয়েছে। অশোকনগরের তেলের এপিআই গ্র্যাভিটি ৪০-৪১। উত্তর আমেরিকায় উত্তোলিত তেলের এপিআই গ্র্যাভিটি ৩৯.৬ ডিগ্রি। উত্তর সাগরে উৎপাদিত তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের ঘনত্ব প্রায় ৮৩৫ কেজি প্রতি ঘনমিটার, যা ০.৮৩৫ এর আপেক্ষিক গুরুত্ব বা ৩৮.০৬ এর এপিআইয়ের গুরুত্বের সমতুল্য। এই ব্লকের থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল ইন্ডিয়ান অয়েলের হলদিয়া শোধনাগারে পরিশোধন করা হবে বলেও জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে কয়েকশো কোটি টাকা লগ্নি করা হয়েছে, আগামী দিনেও আরও লগ্নি করা হতে পারে বলেও জানা গিয়েছে।  

অশোকনগর কিউপিএস কেন্দ্র (কুইক প্রোডাকশন সিস্টেম) বাইগাছিতে বর্তমানে যে মেশিনগুলি কাজ করছে তার মধ্যে ড্রিলিং রিগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এর সাহায্যে মাটির গভীরে কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়। এছাড়াও রয়েছে ড্রিল বিট। যা ড্রিলিং রিগের নীচে লাগানো শক্ত ধাতব বা হীরার তৈরি কাটার, যা পাথর ও মাটি ভেদ করে। এরপর ব্যবহার করা হবে কূপ থেকে নিয়মিত তেল তোলার জন্য পাম্পজ্যাক। 

শমীক ভট্টাচার্য জানান, ২০১৮ সাল থেকে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকার কোনও ভাবেই পিএমএল দেয়নি। অবশেষে গত বাজেটে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পিএমএল-এর কথা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যেই ওএনজিসি তরফে এক হাজার কোটি টাকা ইনভেস্ট করা হয়েছে। ফলে এখান থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব রাজ্য সরকার পাবে। ফলে ওই এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও পরিবর্তন হবে। বিগত সরকার যদি আরও প্রকল্পটি নিয়ে আন্তরিক হতো তাহলে পশ্চিমবঙ্গের অনেক সমস্যার সমাধান হতো। এরপরই, জুলাই থেকেই তেল উত্তোলন হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন শমীক। তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রের তরফে ১৯টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল রাজ্য সরকারকে। গত সরকারের অনীহাকেই এই প্রকল্পের বিলম্বের কারণ হিসেবে দায়ী করছেন বিজেপির এই শীর্ষ নেতা। অকারণ কেন্দ্র বিরোধীতার কারণে বিগত সরকার কেন্দ্রের নানা প্রকল্পকেই বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। এবার অশোকনগর ওএনজিসি কেন্দ্রের পাশাপাশি রানাঘাট সহ জঙ্গলমহলেও ম্যাঙ্গানিজ উঠবে, ফলে আসার আলো দেখতে পাবে বঙ্গবাসী। 

অশোকনগর বাইগাছি কেন্দ্রের যেখানে খনন করা সেখানে ২৪৫০ মিটার*২০০৬ মিটার পর্যন্ত এখনও পৌঁছনো গিয়েছে। এখন আর বাকি মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ মিটার। ২৪ ঘন্টায় মাত্র দেড়শ মিটার গভীরতায় যাওয়া যায় বলেই জানালেন ওই প্রকল্পে কাজ করা দক্ষ কর্মীরা। এই হিসেবে চললে জুলাইয়ের শেষ দিকে তেল উত্তোলন সম্ভব বলেও জানান তারা। অতীতে যে কূপ খনন করা হয়েছিল তার থেকে তেল না মেলায়, আবার নতুন করে কুপ খনন করা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে। এরপর জোন ভাগ করে তেল উত্তোলন করা হতে পারে। সেই লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই এখন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চলছে কাজ এই কেন্দ্র থেকেই প্রথম উত্তোলন করা হবে তেল। আরও অত্যাধুনিক মেশিন নিয়ে আসা হবে বলেও জানা গিয়েছে এই প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের তরফে। এখন লাগাতার দু’টি শিফটে প্রায় শতাধিক কর্মী কাজ করে চলেছেন। ওএনজিসি প্রকল্প এলাকায় দীর্ঘ প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সুউচ্চ পাঁচিলও তোলা হয়েছে। এখনও প্রকল্প কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা কাঁচা থাকায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আগামী দিনে ভারী যন্ত্র-সহ গাড়ি আসলে সে ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাই ওএনজিসির এই প্রকল্প কেন্দ্র থেকে হাবরা নৈহাটি রোড পর্যন্ত রাস্তা তৈরি বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে প্রশাসনের তরফে বলে জানা গিয়েছে। আগামী দিনে অত্যাধুনিক মেশিন-সহ তেল উত্তোলনের পর ট্যাঙ্কারে করে সেগুলিকে সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে এই জায়গা আরও জমজমাট হয়ে উঠবে। প্রকল্প এলাকায় আলোর সমস্যা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে তার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানা গিয়েছে। পরবর্তীতে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও করা হতে পারে প্রকল্প এলাকায় বলে সূত্রের খবর। ফলে জুলাই মাসে অশোকনগর ওএনজিসি কেন্দ্র থেকে খনিজ তেল উত্তোলনের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়িত হওয়ার দিকেই তাকিয়ে অশোকনগর তথা জেলা-সহ রাজ্যবাসী।