আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রতিবছরের মতো এবছরও মাঘ মাসের মহাসপ্তমীতে মুর্শিদাবাদের রাজুয়া দিঘিতে ঘট ভরে শুরু হলো 'প্রাক বসন্তের দুর্গাপুজো' অর্থাৎ দেবী রাজরাজেশ্বরীর আরাধনা। মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি-১ ব্লকের বংশবাটী গ্রামে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় রাজরাজেশ্বরী মায়ের পুজো। এটি একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও সম্প্রীতির প্রতীক উৎসব।
ধীরে ধীরে আমাদের রাজ্য থেকে যখন শীত বিদায় নিতে শুরু করে তখন প্রতিবছর মাঘ মাসে সুতির বংশবাটী এলাকার মানুষ মাতেন দুর্গা পুজোর আনন্দে। শুনতে অবাক লাগলেও প্রায় ৩০০ বছর ধরে বসন্তকালে এই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে বংশবাটী গ্রামে। যদিও জেলাবাসীর কাছে এই পুজো রাজরাজেশ্বরী দেবীর পুজো নামেই বেশি পরিচিত।
রবিবার সকালে স্থানীয় রাজুয়া দিঘির ঘাটে মঙ্গল ঘট ভরে এই পুজোর সূচনা করেন পুরোহিত বাবুরাম মজুমদার এবং নিতাই চক্রবর্তী। প্রাক বসন্তের এই দুর্গাপুজোর আনন্দে এখন মাতোয়ারা সমগ্র জেলাবাসী। দেবীর দর্শন পেতে রবিবার থেকেই মণ্ডপে ভিড় জমিয়েছেন মুর্শিদাবাদ বীরভূম সহ পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের প্রচুর মানুষ।
রাজরাজেশ্বরী দেবীর পুজো উপলক্ষে গ্রামে বসেছে বড় মেলা। পুজোর দিনগুলোতে থাকছে বাউল গান, নাটক এবং কবি গানের আসর। রাজরাজেশ্বরী দেবীর পুজো এখন আর নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সীমিত নেই। এই দুর্গোৎসব এখন সম্প্রীতির উৎসব। হিন্দু মুসলিম সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ প্রত্যেক বছর এই পুজোতে শামিল হন। মহাসপ্তমীতে রাজরাজেশ্বরী মায়ের পুজো শুরু হয়ে চলে মাঘী পূর্ণিমা পর্যন্ত।
গ্রামের বসিন্দা তথা এই পুজো কমিটির অন্যতম সদস্য নিখিল আচার্য বলেন,"দেবী দুর্গার ষোড়শী রূপ হল রাজ রাজেশ্বরী। এখানে দেবী শবাসনে বিরাজমানা।" বংশবাটির মন্দিরে দেবী প্রতিমা কাঠামোতে শব রূপী শিব শায়িত থাকেন। শিবের নাভি থেকে প্রস্ফুটিত হয় দু'টি পদ্ম। দেবী রাজরাজেশ্বরী শবাসনে বিরাজ করেন আর ধরিত্রীকে ধারণ করে থাকেন। দেবীর সঙ্গে একই কাঠামোতে বিরাজ করেন চতুর্মুখী ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এবং ধর্মরাজ। দু'পাশে দুই সখী জয়া এবং বিজয়াকে নিয়ে চতুর্ভূজা মা রাজ রাজেশ্বরীর অধিষ্ঠান। দেবীর বাহন সিংহ।" ধুলিয়ান এলাকার এক শিল্পী অগ্রহায়ণ মাস থেকে মন্দিরেই এই প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, প্রায় ৩০০ বছর ধরে মাঘ মাসে দেবী রাজরাজেশ্বরীর পুজো হয় বংশবাটী গ্রামে। প্রতিবছর ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন মূল পুজো অনুষ্ঠিত হয়। তবে দেবীর ঘট ভরা হয় সপ্তমীর দিন। দশমীর দিন থেকে মাঘী পূর্ণিমা পর্যন্ত দেবীর নিত্য পুজো হয়।
এই পুজো কমিটির অপর এক সদস্য অকালি মাঝি বলেন, "দুর্গাপুজোর মতন সমস্ত রীতি মেনে দেবী রাজরাজেশ্বরীর পুজো হয়। পুজোর সপ্তমী এবং নবমীর দিন দেবীর উদ্দেশ্যে মোষ এবং ছাগ বলি দেওয়া হয়। গ্রামের যে সমস্ত বাসিন্দা কর্মসূত্রে বা অন্য কারণে বাইরে থাকেন তাঁরা এই পুজো উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন।" দশমীর দিন গ্রামের মহিলারা দেবী মূর্তির সামনে সিঁদুর খেলায় মাতেন।
শোনা যায়, বহু বছর আগে ভয়ঙ্কর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল বংশবাটী গ্রাম। সেইসময় রাজুয়া দিঘি নামে একটি বৃহৎ জলাশয় থেকে দেবী রাজ রাজেশ্বরী উঠে এসে গোটা গ্রামকে রক্ষা করেন। তারপর থেকেই দেবী রাজ রাজেশ্বরী ওই গ্রামে দেবী দুর্গা হিসেবেই পূজিতা হয়ে আসছেন।
কথিত আছে , জনৈক ভবানন্দ ভট্টাচার্য নামে এক নিঃসন্তান দম্পতি রাজুয়া দিঘির পাড়ে দেবী রাজ রাজেশ্বরীর দেখা পেয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারেই প্রথম এই পুজো শুরু হয়। সেই পুজোই এখন বারোয়ারি পুজোর রূপ পেয়েছে। তৈরি হয়েছে মাতৃ মন্দির। মন্দিরের হাতে থাকা জমিতে উৎপন্ন ধান, পুকুরের মাছ বিক্রি করে এবং আমজনতার চাঁদায় মন্দিরের পুজো হয়।
রাজরাজেশ্বরী দেবীর পুজো উপলক্ষে ইতিমধ্যেই মন্দির চত্বর এবং আশেপাশের এলাকা সুন্দর আলোর মালায় সেজে উঠেছে। দেবী রাজরাজেশ্বরী পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও সামাজিক ঐক্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন যা মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার বাসিন্দারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে আসছেন।
