আজকাল ওয়েবডেস্ক: অবশেষে শাপমোচন। 'বিচারাধীন' তকমা ঘুচল শতায়ু শেখ ইব্রাহিমের। এর আগে তাঁর সঙ্গে গোটা পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। এখন তা কেটে গেছে।
অবশেষে, ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিচারে উত্তীর্ণ হয়ে ভোটাধিকার ফিরে পেলেন ’শতায়ু’ পার করা পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের শেখ ইব্রাহিম। একই সঙ্গে শেখ ইব্রাহিমের দুই পুত্র ও পুত্রবধূরাও ফিরে পেয়েছেন ভোটাধিকার।
'বিচারাধীন' ভোটারের তকমা খুইয়ে সাপ্লিমেন্টারি (অতিরিক্ত ) তালিকায় বৈধ ভোটার হিসাবে বিবেচিত হয়ে খুশি জামালপুরের শেখ পরিবারের সদস্যরা। আসন্ন বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের জন্য তাঁরা এখন মুখিয়ে আছেন।
১০৪ বছর বয়সি শেখ ইব্রাহিম জামালপুর ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামের ১৩৮ নম্বর বুথের ভোটার এবং আদি বাসিন্দা। ইব্রাহিম দাবি করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে তাঁর জন্ম। তাঁর স্ত্রী আসেমা বেগম ১৮ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন।
ইব্রাহিমের ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েরা বিবাহিত।ছেলেরা বত্রিশবিঘা গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন। তাঁরা পরম স্নেহে তাঁদের বৃদ্ধ বাবাকে আগলে রেখেছেন। বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দারাও তাঁদের গ্রামের সব থেকে বয়ঃজ্যেষ্ঠ সেখ ইব্রাহিমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে স্থান দিয়ে রেখেছেন।
বাংলায় এসআইআর (SIR) পর্ব শুরু হওয়ার পর গত ২৯ জানুয়ারি প্রবীণ শেখ ইব্রাহিমকে সশরীরে ব্লকের বিডিও অফিসে 'শুনানিতে' হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কথা তাতে উল্লেখ থাকে। ওই নোটিশ বৃদ্ধের বাড়িতে পৌঁছে দেন ১৩৮ নম্বর বুথের বিএলও(BLO)। তা নিয়ে তোলপাড় পড়তেই কমিশনের প্রতিনিধিরা ১০৪ বছর বয়সি শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে গিয়ে শুনানি সারেন।
তাঁর সঙ্গে তাঁরা বৃদ্ধর প্রয়োজনীয় নথিপত্রও যাচাই করে যান। তারপরে প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় শেখ ইব্রাহিমের নাম ’বিচারাধীন’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। সেটা জেনে বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিম বড়ই হতাশ হন। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি তখন বলেন, "দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও আমি ভোট দিয়েছি। তা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় কেন আমায় বিচারাধীন হিসাবে চিহ্নিত করা হল তা আমি বুঝে উঠতে পারছি না। ১০৪ বছর বয়সেও আমি বেঁচে রয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ হয়ে গেছে ! তাই কি ভোটার তালিকায় আমার নাম রাখা নিয়ে কমিশন এইভাবে আমায় অপদস্ত করছে?"
বৃদ্ধ বাবাকে হয়রান হতে হওয়ার জন্য ইব্রাহিমের ছেলেরাও সে সময়ে কমিশনকে ’অমানবিক’ আখ্যা দিতে পিছপা হননি। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত শরীর নিয়ে ঘরে বসে শেখ ইব্রাহিম মঙ্গলবার বলেন, "আমি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি, ভারত স্বাধীন হতেও দেখেছি। এমনকী হাওড়া ব্রিজ তৈরি থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও দেখেছি। গান্ধীজির ডাকা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মিছিলে আমিও ছুটে গিয়েছি। এখন বয়সের ভারে আমি আর ভাল ভাবে হাঁটাচলা করতে পারি না। আমার মতো একজন প্রবীণের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ’বিচারাধীন’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে জেনে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম। শেষ অব্দি
সঠিক বিচার করে ভারতের নির্বাচন কমিশন আমাকে দেশের প্রকৃত নাগরিক মেনে নিয়ে বৈধ একজন ভোটারে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে আমি খুবই খুশি হয়েছি।"
বৃদ্ধের ছেলে শেখ রাইহান উদ্দিন ও শেখ আরেফুল ইসলাম বলেন, "আমাদের বাবা দেশের একজন অতি প্রবীণ নাগরিক। বর্তমানে বাবার বয়স ১০৪ বছর। তার পরেও এসআইআর (SIR) পর্বে প্রকাশ হওয়া চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় আমাদের বাবার নাম ’বিচারাধীন’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।" এমনকী শেখ ইব্রাহিমের দুই পুত্র ও পুত্রবধূর নামও বিচারাধীন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যা তাঁদের কাছে বড়ই অসম্মানের হয়ে উঠেছিল। সোমবার গভীর রাতে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা সাপ্লিমেন্টারি (অতিরিক্ত ) ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখেন তাঁরা। তখনই নিশ্চিত হন, সকলেরই নাম
দেশের বৈধ ভোটার হিসাবে ভোটার তালিকায় স্থান পেয়েছে।
এ নিয়ে জামালপুর বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ভূতনাথ মালিক বলেন, "দেশের প্রবীণ নাগরিক শেখ ইব্রাহিমকে এতদিন দুশ্চিন্তায় রেখে নির্বাচন কমিশন সঠিক কাজ করেনি। আমাদের দলনেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এসবের জন্য নিজে সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করেছেন। সেই লড়াইয়ের ফল আজ পেলেন শতায়ু পার করা শেখ ইব্রাহিম এবং তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূরা।"















