গৌতম রায়: অনীক দত্তের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর প্রথমেই মনে পড়ছে, তাঁর বহুল আলোচিত ছবি, 'ভবিষ্যতের ভূত' রিলিজ হওয়া ঘিরে নানা ধরনের লড়াইয়ের জায়গাটা। একজন স্রষ্ঠাকে যদি তাঁর সৃষ্টিকে প্রকাশ্যে আনতে গেলে আইনি লড়াইও লড়তে হয়, সেই বিষয়টা যে কতটা যন্ত্রণার, দুঃখের-তা বুঝতে গেলে শিল্পী হতে হয় না। শিল্পের প্রতি ভালবাসাটাই যথেষ্ট।
দায়বদ্ধতাই অনেকখানি। নিজের সৃষ্টিকে দিনের আলো দেখানোর ক্ষেত্রে ঋত্ত্বিক ঘটকের যে যন্ত্রণা, অনীক দত্তের যন্ত্রণার সঙ্গে তার যথেষ্ট সামঞ্জস্য আছে।
ঋত্ত্বিকের মতোই অনেকটা ঠিক তেমন যন্ত্রণাই যে অনীক দত্তেরও ছিল-এটা আমরা অনেকেই জানতাম। কিন্তু হয়তো ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে আমরা অনেকেই সময়মতো অনেক কিছুই ভুলে থাকতে ভালবাসি। সেই রকম ভালবাসার সঙ্গে গেরস্থালি পাতাবার ইচ্ছেই হয়তো অনীক দত্তের পরের ফিল্ম, 'ভবিষ্যতের ভূত' ঘিরে সেই সময়কালের বিষয়গুলোকে আমরা ভুলে থাকতেই ভালবেসেছি। তাঁর প্রয়াণের পর কারও হয়ত মনে পড়েছে, অনীকের সেদিনের যন্ত্রণাটা। যে ব্যথা তিনি শেষদিন পর্যন্ত নিশ্চয়ই বুকের ভিতরে জমিয়ে রেখেছিলেন।
এখানেই মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন নতুন সরকার, যাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে অনীকের রাজনৈতিক মতাদর্শের এতটুকু মিল নেই। যাদের রাজনৈতিক ভাবনার ঘোরতর সমালোচক ছিলেন অনীক। তাঁর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর, সেই সরকার অনীকের প্রতি যে সৌজন্য দেখিয়েছে, সম্মান প্রদর্শন করেছে-তা সত্যিই অনুকরণযোগ্য। সম্পূর্ণ বিপক্ষ ভাবনার একজন বিশিষ্ট মানুষের প্রয়াণের পর মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন পুষ্পার্ঘ দিতে-- এমনটা পশ্চিমবঙ্গ, বাঙালি অনেকদিন দেখেনি। অনীক যেন নিজের জীবনের বিনিময়ে রাজনৈতিক সৌজন্যের এক নতুন রাস্তা খুলে দিয়ে তারাদের দেশে চলে গেলেন।
' ভূতের ভবিষৎ'-বাঙালিকে তির্যক রসবোধে নতুন করে একটা দিশা দিয়েছিল। বাঙালির শিল্প-সাহিত্যে যখন বঙ্কিমী কমলাকান্ত প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, এই ফিল্মটি তখন সেই ধারার একটা নবায়ন ঘটিয়েছিল। হাসি, মজা মানেই যে সেটা স্থূল কোনও বিষয় নয়। তরল বিষয় তো নয়ই। এই বিষয় আবার নতুন করে মানুষের কাছে তুলে ধরবার ক্ষেত্রে অনীক দত্ত একটা দিশা জুগিয়েছিলেন।
'অপরাজিত' - ফিল্ম- বাংলা ফিল্মের দুনিয়ায় এক মাইল ফলক। সত্যজিৎ রায়কে ঘিরে বায়োপিক-এটা আগে বাঙালির চিন্তার দুনিয়াতেই আসেনি। আম বাঙালি অনেককাল পরে একেবারে মজে গিয়েছিল এই ফিল্মে। বিশেষ করে নবীন প্রজন্ম, যাদের জন্মের অনেক আগেই সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ হয়। তারা যে 'অপরাজিত' ছবিটার মধ্যে ব্যক্তি সত্যজিৎকে প্রায় ছুঁতে পেরেছিল। নবীন প্রজন্মের এই অনুভূতি সাম্প্রতিককালের সাংস্কৃতিক দুনিয়াতে তার আগে অন্য কোনও ফিল্ম ঘিরে হয়নি। প্রযুক্তির আধুনিকতায় সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা প্রায় উঠেই গিয়েছিল, তখন মানুষকে হলমুখী করবার ক্ষেত্রে অনীক দত্তের 'অপরাজিত'-এর খুব বড় ভূমিকা ছিল।
অনীকের একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি কখনও সরে আসেননি। এই রাজনৈতিক বোধের কারণে পেশাগত ক্ষেত্রে বহু অসুবিধা তাঁর হয়েছিল। তবুও তিনি একটা বারের জন্যে আপোষ করেননি। তাঁর এই সোজা শিরদাঁড়াটা অনুসরণ যোগ্য।
যে 'নন্দন'-এ একদিন অনীকের ফিল্ম দেখানো ঘিরে অনেক জটিলতা হয়েছিল, সেই নন্দনে অনীকের মরদেহ আনবার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। সাধারণ মানুষকে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ করে দিয়েছে। অনীক যেন ঝড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ি ভাঙা দরজাটাকে মিলিয়ে দিয়ে গেলেন। রাজনীতির বিরোধ যাই থাক। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গন যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সৃষ্টির পথকে এগিয়ে নিয়ে চলে- অনীকের প্রয়াণজনিত সৌজন্যের এই চিত্র চিরস্থায়ী হোক।















