আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন দল এখন শিরোপা থেকে মাত্র দুই ধাপ দূরে। তবে দলের সাফল্যের সঙ্গে আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক। আর্জেন্টিনার প্রত্যেক বড় জয়ের পরই সামাজিক মাধ্যমে রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, দক্ষিণ আমেরিকার দল বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত। আর্জেন্টিনা যদি ফাইনালে ওঠে, সেই ম্যাচ পরিচালনা করবেন না কোনও ইংরেজ রেফারি। 

ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞ রেফারি মাইকেল অলিভার এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ পরিচালনা করা ইংরেজ রেফারি। পারফরম্যান্সের বিচারে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের অন্যতম দাবিদার তিনি। কিন্তু ফিফার রেফারি নিয়োগে শুধু দক্ষতাই নয়, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইংল্যান্ড যদি ফাইনালে ওঠে, সেক্ষেত্রে ইংরেজ রেফারিদের দায়িত্ব না পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায়, তবুও মাইকেল অলিভার বা অ্যান্থনি টেলরকে বাঁশি হাতি দেখা যাবে না। এর প্রধান কারণ, আর্জেন্টিনা এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ।

১৯৮২ সালের ৭৪ দিনের ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি এখনও দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। সেই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য এবং তিনজন ফকল্যান্ড দ্বীপবাসীর মৃত্যু হয়। যুদ্ধের পর ব্রিটেন দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও আর্জেন্টিনা এখনও সেগুলোর ওপর রাজক্ষমতা দাবি করে আসছে। দেশের প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার মাইলেইও সম্প্রতি সেই দাবির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এই কারণেই ফিফা কোনও ধরনের বিতর্কের সুযোগ দিতে চায় না। ফিফার মতে, রেফারি পক্ষপাতী হবে কি না সেটা নয়, বরং তাঁর নিয়োগ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই নীতি শুধু ফাইনালের ক্ষেত্রেই নয়, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই প্রযোজ্য। ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা একই দিকে থাকায় সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালেও ইংল্যান্ড এবং নরওয়ের রেফারিদের বিবেচনা করা হয়নি। কারণ সেই ম্যাচের বিজয়ী দলই সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বা নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনায় ছিল। বিশ্বকাপে এমন উদাহরণ আরও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রেফারিদের সাধারণত ইরানের ম্যাচে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। আবার ইরানের রেফারিরাও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ পরিচালনা করেন না। একইভাবে কোনও রেফারিকে এমন ম্যাচেও রাখা হয় না, যার ফলাফল তাঁর নিজের দেশের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

ঘরোয়া ফুটবলেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়। যেমন ইংল্যান্ডের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা মাইকেল অলিভারকে কখনও নিউক্যাসল ইউনাইটেড বা সান্ডারল্যান্ডের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় না। যাতে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। বিশ্বকাপে রেফারি নিয়োগের দায়িত্ব থাকে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনার ওপর। পারফরম্যান্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভৌগোলিক সম্পর্ক এবং প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষতা, সবকিছুই বিবেচনায় রাখা হয়। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন অ্যান্থনি টেলর। দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠার পর তাঁর ফাইনাল পরিচালনার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। এবারও যদি মেসিদের দল ফাইনালে পৌঁছে যায়, তাহলে মাইকেল অলিভার এবং অ্যান্থনি টেলর, দু'জনেরই বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।