কৃশানু মজুমদার: ঘাটালের মাটির ঘ্রাণ আর দু'চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে উনিশ বছরের এক কিশোর ইডেনের নেটে আগুন ধরালেন। তাঁর প্রতিটি ডেলিভারি যেন আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা ফিসফিস করে বলে ওঠে। ছোট শহর থেকে উঠে আসা এক কিশোরের উজ্জ্বল স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে যায় বিশ্বমঞ্চ। 

এখানেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জয়জয়কার। এখানেই জিতে যায় ক্রিকেট। ক্রিকেটের বৃত্তে মিলেমিশে এক হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্কটল্য়ান্ড, ইতালি আর ঘাটালের সুরজ সানকি। 

কে বলে তাঁর হাতের ধবধবে সাদা বলটা কেবল একটা বল, এ তো একটা সেতুও। মিলিয়ে দিয়ে যায় বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তকে। 

ভারতের তারকা অলরাউন্ডার হার্দিক পাণ্ডিয়া তাঁর হৃদয় জুড়ে। পাণ্ডিয়ার মতোই বল ও ব্যাট করতে পারেন দক্ষতার সঙ্গে। অনেকটা পাণ্ডিয়ার মতোই বল করার ধরনধারণ। বন্ধুমহলে তিনি ইতিমধ্যেই 'পাণ্ডিয়া' নামেই পরিচিত। 

মূল গল্পে ফেরা যাক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আজ অর্থাৎ বুধ-সন্ধ্যায় ইডেন গার্ডেন্সে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউ জিল্যান্ডের প্রথম সেমিফাইনাল। 

শেষ চারের সেই লড়াইয়ের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার নেটে বোলিং করেছেন সুরজ। তারও আগে ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, স্কটল্যান্ড, ইতালির ভয়ঙ্কর সব ব্যাটারদের নেটে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। 

তাঁর বলের লাইন-লেন্থ বুঝতে না পেরে আউট হয়েছেন ক্যারিবিয়ান বিগহিটার রোমারিও শেফার্ড। ভারতের বিপজ্জনক ব্যাটার ঈশান কিষানও মোকাবিলা করতে পারেননি তাঁর বল। ইডেনে সুপার এইটের মহাগুরুত্বপূর্ণ ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠক মাতিয়ে দিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান কোচ ড্যারেন স্যামি। তিনিও সুরজের  বোলিং দেখে প্রশংসা না করে পারেননি। সর্বসমক্ষে  তাঁর পিঠে স্নেহের হাত রেখেছেন। 

বিশ্বখ্যাত তারকাদের ছোঁয়ায় অনুপ্রাণিত উনিশের কিশোর। স্বপ্নের ডানা মেলে আরও এগিয়ে যেতে চান হাইকোর্ট ক্লাবের এই ক্রিকেটার। তাঁর বাবা সুশান্ত সানকি বলছেন, ''ছেলে একদিন বাংলার হয়ে খেলুক, দেশের নীল জার্সিতে খেলে আমাদের গর্বিত করুক, এই প্রত্যাশাই আমার ছেলের কাছে।'' 

বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক মনোজ তিওয়ারি ও হীরক সেনগুপ্ত গড়ে তুলছেন সুরজকে। তাঁদের আশীর্বাদের হাত রয়েছে সুরজের মাথায়। সুশান্ত বাবু বলছেন, ''মনোজ তিওয়ারি ও হীরক সেনগুপ্তর কাছে আমি ঋণী। নিখরচায় আমার ছেলেকে ওঁরা ক্রিকেট শেখাচ্ছেন। কলকাতায় বহু জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলাম, কিন্তু মনোজ তিওয়ারি ও হীরক সেনগুপ্ত পরম ভালবসা, পরম স্নেহে আমার ছেলেকে কাছে ডেকে নিয়েছেন। ওঁরাই সুরজের  সব।'' 

ক্রিকেটের পাশাপাশি বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের উপরে স্নাতক করছেন সুরজ।  কখনও আনন্দনগরী। আবার কখনও বাণিজ্যনগরীতে তিনি। খেলা আর শিক্ষার পাঠ সমান তালে এগোচ্ছে। 

দাদা প্রীতমকে দেখেই ক্রিকেটে আসা সুরজের।  দাদা ছিলেন ব্যাটার। আর ভাই বোলিং অলরাউন্ডার। 

   ‘সুরজ’নামের অর্থ সূর্য। ছোট্ট শহরের এক ছেলে, একদিন ক্রিকেট মাঠে ছড়িয়ে দেবেন সোনালী রোদ্দুর, তাঁর স্বপ্নগুলো রামধনুর মতো রং ছড়াবে নীল আকাশে। 

ছোট শহরের স্বপ্নগুলো সত্যি হোক। ধুলো-মাখা পথে লেখা থাকুক পরিশ্রম, আশা আর সাহসের গল্প। 
এমন দিনের আশায় বুক বাঁধছেন সুরজের বাবা-মা।