কৃশানু মজুমদার: শচীন তেন্ডুলকরের শেষ টেস্টে মাস্টার ব্লাস্টারের ক্যাচ তিনি ধরেছিলেন। ক্রিকেট ঈশ্বরের রান তখন ৭৪। তার পরে আবেগপ্রবণ ড্যারেন স্যামি হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। সেদিন শচীনের ক্যাচ ধরে তিনি কি যন্ত্রণাকাতর ছিলেন?
প্রতিপক্ষের কোনও ব্যাটারকে আউট করে এই ড্যারেন স্যামিই সেলফি তোলার ভঙ্গিতে উদযাপন করতেন।
ড্যারেন স্যামি মানেই ক্রিকেট মাঠে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার আখ্যান তিনি কতই তো লিখে গিয়েছেন সবুজ ঘাসে। সেই ড্যারেন স্যামি ভারতের বিরুদ্ধে নামার আগে বলে দিলেন, ''আমার যোদ্ধারা কিন্তু তৈরি।''
এই ইডেন গার্ডেন্সেই তো স্যামির ওয়েস্ট ইন্ডিজ রূপকথা লিখেছিল ২০১৬ সালে। তার পরে স্যামির কথাগুলো অমর হয়ে রয়েছে। ক্যারিবিয়ান প্রাক্তন অধিনায়ক বলেছিলেন, ''বোর্ড থেকে আমরা খেলার কিছুই পাই না। আমাদের ম্যানেজার এগুলো কলকাতা থেকে নিয়েছেন। আজ রাতের আনন্দ আমি আমাদের কোচিং স্টাফ এবং ১৫ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। জানি না, এর পর আমরা একসঙ্গে মিলিত হতে পারব কিনা। বোর্ড আমাদের ওয়ানডে দলে নেয় না। টি-টোয়েন্টি দলে আমরা সুযোগ না-ও পেতে পারি। এই জয় ক্যারিবিয়ান ভক্তদের উৎসর্গ করতে চাই।''
সেই ড্যারেন স্যামি এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ। এই ইডেন গার্ডেন্সেই যে স্যামি ক্যাপ্টেন হিসেবে অমর হয়ে রয়েছেন, ভারতের বিরুদ্ধে সুপার এইটের খুব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি এলেন সংবাদমাধ্যমের গোলাগুলি সামলাতে। নিজের ঘড়ির দিকে চোখ রেখে স্যামি বলে গেলেন, ''আর ২৬ ঘণ্টা বাকি। কাল ম্যাচ ক'টায়? সন্ধ্যা সাতটায় না? কাল তাহলে শুরু হচ্ছে লাস্ট ড্যান্স! কে এই ড্যান্সে জেতে সেটাই দেখার।''
ড্যারেন স্যামি মানেই সাংবাদিক বৈঠক জমজমাট। ড্যারেন স্যামি মানেই বুদ্ধিদীপ্ত সব কথাবার্তা। তিনি বলছেন, ''ভারতকে হারাতে পারলে আমরা উৎসব তো করবই। তবে কোন গান চালিয়ে নাচব, তা এখনও স্থির করিমনি। উদযাপন তো চলবেই। আমাদের মতো করেই উৎসব করব, উদযাপনে মেতে উঠব। খেলা হবে, তার পরে নাচও হবে।'' স্যামি কি জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করে দিয়েছেন?
স্যামির নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দু'বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই স্যামিকেই অধিনায়কত্ব ছাড়তে হয়েছিল। বোর্ডের উপরে চাপা অভিমান ছিল। এখন তিনি স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আবার।
দশ বছর আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতকে হারিয়েই ফাইনালের টিকিট পেয়েছিল ক্যারিবিয়ানরা। রবিবার ভারতকে থামাতে পারলে মিলে যাবে সেমিফাইনালের ছাড়পত্র। স্যামি বলছেন, ''সেবারের ভারত আর এই ভারত এক নয়। কোনও এক বা দু'জন ভারতীয় ক্রিকেটারের কথা আলাদা করে বলা সম্ভব নয়। পুরো এগারো জনই তো ডেঞ্জারাস। দলটাই ডেঞ্জারাস।''
ইডেনের সবুজ ঘাসে অতীতে নেমেছিল ক্যারিবিয়ান রোদ। ব্রায়ান লারা, কার্ল হুপারের ব্যাট ক্যালিপসোর মূর্চ্ছনা তুলেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কলকাতার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। ড্যারেন স্যামি বলছেন, ''ইডেন গার্ডেন্সে-কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুবই জনপ্রিয়। এখনও এই শহরের মানুষের চোখে ভাসে স্যর ভিভ, ক্লাইভ লয়েডের খেলা। এই সব কিংবদন্তিদের ধন্যবাদ জানাই। তাঁরা বীজ বুনে গিয়েছিলেন, তার সুফল আমরা পাচ্ছি এখন। হোটেলে, রাস্তায় সবাই আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলছেন, বেস্ট অফ লাক। আমরা তাঁদের জিজ্ঞাসা করছি, যা বলছেন, সেটা কি মনের থেকে বলছেন?'' স্যামির কথায় হেসে ওঠেন সবাই।
দশ বছর হয়ে গিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ বার খেতাব জিতেছিল। তার পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট পিছিয়ে চলেছে। এই রোদ তো এই মেঘ! জিম্বাবোয়েকে উড়িয়ে দেওয়ার পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে আবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে তাদের। স্যামি তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দিচ্ছেন। তাঁর যোদ্ধাদের তাতাচ্ছেন।
ইডেন জানে, রবি-সন্ধ্যার হাইভোল্টেজ ম্যাচ কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়। শহরের আবেগ, ঢাকের ছন্দ, পতাকার রং আর সমর্থকদের হৃদস্পন্দন এক হয়ে সুর তুলবে নন্দনকাননে। মায়াবী ইডেনে নেমে আসবে সন্ধ্যা। মিনারের আলো জ্বলে উঠবে। নতুন এক ইতিহাসের জন্য অপেক্ষায় থাকবে বহু যুদ্ধের সাক্ষী ইডেনও।
















