সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: ঘড়ির কাঁটায় প্রায় দুপুর একটা। মাথায় ওপর কাটফাটা রোদ। কিন্তু শীতের বিদায়বেলায় এমন আবহাওয়া যথেষ্ট মনোরম। সময় বলছে, আর দু'ঘণ্টা পরই ইডেনে শুরু বিশ্বযুদ্ধ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে বসছে টি-২০ বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু ইডেন চত্বর খাঁ খাঁ করছে। সচরাচর এই চিত্র দেখতে আমরা অভ্যস্ত নয়। বাঙালিরা বরাবরই হুজুকে। ক্রীড়াভক্ত। সে যে খেলাই হোক না কেন। কিন্তু এদিন বিপরীত ছবি। ইডেনে ভারতের খেলা দেখতে সুপার এইট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু দিনের শেষে বিশ্বকাপের ম্যাচ! তাও আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিকেটের নন্দনকাননেই শেষবার টি-২০ বিশ্বকাপ জেতে ক্যারিবিয়ানরা। হঠাৎ ইডেনের দুই নম্বর গেটের সামনে চোখে পড়ল বড় চেহারার এক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানকে। 

ক্যারিবিয়ানরা বরাবরই বর্ণময়। তাঁর পোশাকেও তারই ছাপ। পরনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সি। মাথায় লম্বা হ্যাট। তাতে লেখা ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো। গলায় জড়ানো ওয়েস্ট ইন্ডিজের পতাকা। খাকি শর্টস এবং নীল জুতো। চোখে সানগ্লাস। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরও দু'জন ক্যারিবিয়ান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের বর্তমান হাল হতাশাজনক। কোনও ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু সুদূর ত্রিনিদাদ এবং টোবাগো থেকে ছুটে এসেছেন তিন বন্ধু। দু'দিন আগে মুম্বই পৌঁছেছে ডেরেক আর্চার, রয় মোজেজ এবং রিচার্ড অ্যালেক্সজান্ডার। সেখান থেকে শুক্রবার রাতে কলকাতায়। শনি দুপুরে তখন সবেমাত্র ইডেনে পৌঁছেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বাস। তার সামনে দাঁড়িয়ে সাই হোপদের জন্য গলা ফাঁটাতে দেখা যায় ত্রয়ীকে। ২০১৬ থেকে ২০২৬। মাঝে দশ বছর। সেদিন মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম থেকে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন আর্চার। কলকাতায় কার্লোস ব্রেথ‌ওয়েটের ঐতিহাসিক চার ছক্কায় বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী থাকতে পারেননি। সেমিফাইনালের পর ব্যক্তিগত কারণে দেশে ফিরে যেতে হয়েছিল। সেই আফসোস এখনও যায়নি। তাই এবার কলকাতা থেকেই শুরু তাঁদের বিশ্বকাপ অভিযান। 

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপ দলের ফিজিও অ্যালেনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ম্যাচের দিন সকালে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে টিম হোটেলে। অ্যালেন জানান, 'দলের স্পিরিট ভাল আছে। আশা করছি আমরা এবার ভাল খেলব।' ২০১৬ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তির আশায় ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট ভক্ত। আর্চার বলেন, 'তরুণ দল। কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে না। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না। ২০১৬ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর বিষয়ে আশাবাদী। আমি আগের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াতেও গিয়েছি। তবে এবার সবাই খুব আত্মবিশ্বাসী। আমার বিশ্বাস, ছেলেরা নিজেদের প্রতিভা অনুযায়ী খেলতে পারলে, আমরা যেকোনও দলকে হারাতে পারব।' সাই হোপদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ কারা? মুহূর্তের মধ্যে আসে পরিচিত উত্তর। আর্চার বলেন, 'ভারত সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ। ওদের হারানো খুবই কঠিন। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া আছে।' টিম ইন্ডিয়ার বর্তমান টি-২০ দলের বিশেষ কাউকে চেনেন না। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মার ভক্ত। ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুটো ম্যাচ আছে। ত্রিনিদাদ টোবাগো থেকে আসা ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটপ্রেমী জানান, আবহাওয়া কোনও সমস্যা নয়। আর্চার বলেন, 'ভারতের খাবারের সঙ্গে মিল আছে ত্রিনিদাদের খাবারের। মশলাদার, তবে ভাল লাগে। এখানকার মানুষের সঙ্গে আমাদের দেশের লোকেদের প্রচুর মিল। আবহাওয়াতেও মিল আছে। তবে ভারতে গরম অনেক বেশি। কিন্তু এই মুহূর্তে আবহাওয়ায় বিশেষ পার্থক্য নেই।' 

শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমর্থক নয়, শনি দুপুরে খুঁজে পাওয়া যায় স্কটল্যান্ডের এক মহিলা সাপোর্টারকে। জন্মসূত্রে স্কটিশ হলেও, ইংল্যান্ডে থাকেন। কলকাতায় এসেছেন এক বন্ধুর বিয়ের আমন্ত্রণে যোগ দিতে। কোনওদিন স্কটল্যান্ডের ম্যাচ দেখেনি। তাই রথ দেখা কলা বেঁচার সুযোগ হাতছাড়া হতে দেননি। তবে নিজের পছন্দ বেছে নেন ওয়েন্ডি স্মিথ। জানান, 'বিশ্বকাপ জিতবে ভারত।'

স্মিথ বলেন, 'আমি কোনওদিন স্কটল্যান্ডের ম্যাচ দেখিনি। দলের থেকে তেমন কোনও আশা নেই। শুধু ম্যাচটা উপভোগ করতে চাই। বিশ্বকাপ জিতবে ভারত।' দুপুরে ইডেনের চিত্র হতাশ করলেও, ম্যাচের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবি বদলায়। ভরতে শুরু করে গ্যালারি। বিকেল চারটেয় প্রায় ১২ হাজার ক্রিকেটপ্রেমী ইডেন ভরায়। স্কুল এবং কোচিং ক্যাম্পে থেকে প্রায় ৪০০০ ছাত্রছাত্রীকে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করে সিএবি।