সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: ইডেনের এক রাত। দুটো ওভার। রাতারাতি জীবন বদলে দিয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের মুখে ঘুরছে একটিই নাম, মুকুল চৌধুরী। গুগল সার্চ ইঞ্জিনেও চড়চড় করে বাড়ছে দর। লখনউ সুপার জায়ান্টসের একজন সাধারণ উঠতি ক্রিকেটার থেকে ম্যাচ উইনার। আয়ুশ বাদোনিকে ঘিরে বেঁচে ছিল সঞ্জীব গোয়েঙ্কার দলের জয়ের আশা। তিনি আউট হতেই যাবতীয় সম্ভাবনায় জলাঞ্জলি। নিভে যায় স্বপ্ন। ক্রিজে তখন আনকোড়া একজন উইকেটকিপার ব্যাটার। বৃহস্পতি রাতে ইডেনে মুকুল ফুটবে, তার কল্পনা হয়ত করেনি লখনউ ম্যানেজমেন্টও। প্রথম দুই ম্যাচে সাফল্য পাননি। ম্যাচ জেতা দূর অস্থ, কতক্ষণ উইকেটে টিকে থাকতে পারবেন, সেই নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবির্ভাবেই সাফল্য। আইপিএল অনেক তারকার জন্ম দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ক্রিকেটের নন্দনকানন কি সাক্ষী থাকল নতুন এমএস ধোনির উত্থানের? 

মাত্র এক ইনিংস দেখে ২১ বছরের উঠতি ক্রিকেটারকে এতটা দরাজ বা বড় সার্টিফিকেট দেওয়া উচিত হবে না। তবে নিঃসন্দেহে ক্যাপ্টেন কুলকে মনে করান মুকুল। শুধুমাত্র হেলিকপ্টার শট দিয়ে নয়, ঠাণ্ডা মাথায় দলকে বৈতরণী পার করানোর ক্ষেত্রেও। আগের দিনই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে গুজরাট টাইটানসকে জেতাতে পারেননি অভিজ্ঞ ডেভিড মিলার। সেখানে এক তরুণ উঠতি ক্রিকেটার যেভাবে ম্যাচের কন্ট্রোল নিজের হাতে নিয়ে নেয়, এককথায় অনবদ্য। অন্য প্রান্তে থাকা আবেশ খানকে মাত্র তিন বল খেলতে দেন। মুকুলের এই ইনিংস ধোনিকে মনে করায় দীনেশ লাডকে। শুক্রবার বাড়িতে টিভির পর্দায় লখনউ জয়সূচক রান নেওয়ার পর চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠেন রোহিত শর্মার ছোটবেলার কোচ। তার পরামর্শ কাজে লাগিয়ে দলকে জেতান মুকুল। তাতে উল্লসিত দীনেশ লাড। 

রাজস্থানের তরুণ উঠতি ক্রিকেটারের সঙ্গে মুম্বইয়ের হাই-প্রোফাইল কোচের কী সম্পর্ক? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে কেকেআরের বিরুদ্ধে মুকুলের এই জয়সূচক ইনিংসের পেছনে অবদান রয়েছে রোহিতের কোচের। চলতি বছর মুস্তাক আলি ট্রফির আগে মুম্বইয়ে কিছুদিন দীনেশ লাডের থেকে প্রশিক্ষণ নেন মুকুল। রোহিতের কোচের পরামর্শে ব্যাট গ্রিপ করার টেকনিক পাল্টান। নাইটদের বিরুদ্ধে ইডেনে নামার আগে কথা হয় দীনেশ লাডের সঙ্গে। স্ট্রেট ব্যাটে খেলার পরামর্শ দেন রোহিতের প্রাক্তন কোচ। তাতেই সাফল্য। তাই স্বভাবতই উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেননি। আজকাল.ইনকে ফোনে দীনেশ লাড বলেন, 'কিছুদিনের জন্য আমার কাছে এসেছিল। মুস্তাক আলির আগে। আমার এক ছাত্র অনুপ ধাবের থেকে আমার কথা শোনে। তারপর আমার কাছে আসে। আমি ওর গ্রিপে পরিবর্তন আনি। তারপর ফিরে গিয়ে ভাল খেলেছিল। আমার পরামর্শ মেনে সাফল্য পাওয়ায় আমি খুশি। আমি ওর গ্রিপে একটু পরিবর্তন আনি। তারপর ওর ব্যাটিংয়ে উন্নতি হয়। আমি ওকে ইতিবাচক মনোভাব রাখতে বলি। কারণ আমি ওর ব্যাটিং দেখেছি। জানতাম প্রতিভা আছে। ও উইনিং রান নেওয়ার পর আমি চিৎকার করে উঠি। সোমবার ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। ওকে স্ট্রেট ব্যাটে খেলতে বলি। সেটা শুনেছে।' 

মুকুলের মধ্যে ভবিষ্যতের ধোনিকে খুঁজে পান দীনেশ লাড। ক্যাপ্টেন কুলের অবসরের পর কোনও নির্দিষ্ট উইকেটকিপার নেই ভারতের। তিন ফরম্যাটেই বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। রোহিতের ছোটবেলার কোচ মনে করছেন, নিজেকে ধরে রাখতে পারলে, ভবিষ্যতে ধোনির জায়গা নিতে পারেন রাজস্থানের ক্রিকেটার। দীনেশ লাড বলেন, 'মাত্র ২১-২২ বছর বয়স। যদি পরিশ্রম করে, ভাল খেলতে পারে, ভবিষ্যতে ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওর সঙ্গে ধোনির মিল আছে। কেকেআরের ঘরের মাঠে, এত দর্শকের সামনে এমন ইনিংস। শান্ত, ধীর-স্থির স্বভাবের। যেভাবে ব্যাট করেছে তাতে অভিভূত। যেভাবে হ্যান্ডেল করেছে, অনবদ্য। যেভাবে ব্যাট করছিল, আমার মনে হয়েছিল হয়ত লখনউকে ম্যাচটা জিতিয়ে দেবে। এমএসের মতো খেলেছে। ঠাণ্ডা মাথায়। ওকে দেখে মনে হয়েছে ধোনি ব্যাট করছে। যদি নিয়মিত ভাল খেলতে পারে, আগামী ৪-৫ বছরে জাতীয় দলে সুযোগ পেতে পারে। লোয়ার অর্ডারের ভাল উইকেটকিপার ব্যাটার নেই। ও তিন ফরম্যাটের প্লেয়ার।' 

সাফল্য মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু মাটিতে পা উঠতি তারকার। মাত্র কয়েকদিন প্রশিক্ষণ নিলেও কৃতিত্ব রোহিত শর্মার ছোটবেলার কোচকে দেন মুকুল। ম্যাচ জেতার পর একটি ভিডিও বার্তায় মুকুল বলেন, 'আমি রাজস্থানের হয়ে রঞ্জি ট্রফি এবং মুস্তাক আলি ট্রফি খেলেছি। তার আগে আমি মুম্বইয়ে দীনেশ লাড স্যারের থেকে ট্রেনিং নিই। ব্যাটিংয়ে আমার কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা হচ্ছিল। দীনেশ স্যার আমাকে সঠিক টেকনিক দেখিয়ে দেয়। তাতে আমার ব্যাটিংয়ে উন্নতি হয়েছে। আমি আগের থেকে ভাল ব্যাট করছি। পজিটিভ রেজাল্ট পেয়েছি। দীনেশ স্যার কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাকে সাহায্য করছে। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।' রঞ্জি ট্রফি, মুস্তাক আলি থেকে সরাসরি আইপিএলের মঞ্চে। তারওপর আবির্ভাবেই চমক। তবে প্রথম দুই ম্যাচে ব্যর্থ হন। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট আস্তা দেখায়। জাস্টিন ল্যাঙ্গারের বিশেষ উল্লেখ করেন দীনেশ লাড। অতীতে আশা জাগিয়ে শুরু করলেও, বাইশ গজে অনেক স্বপ্ন 'মুকুলেই ঝরে যায়'। রোহিতের কোচের আশা, ধোনির মতো বটবৃক্ষ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে এই মুকুলে।