বাঙালির হৃদয়ে অমলিন ঋতুপর্ণ ঘোষ, ফিরে দেখা সেই চিরউজ্জ্বল নক্ষত্রের পথচলা
নিজস্ব সংবাদদাতা
৩০ মে ২০২৬ ১৮ : ০৫
শেয়ার করুন
1
13
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কয়েকজন মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু সিনেমা বানাননি, বদলে দিয়েছেন দর্শকের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি। যাদের মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ অন্যতম। ২০১৩ সালের ৩০ মে অকালে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন তিনি। তাঁর সৃষ্টি আজও বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
2
13
বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন ঋতুপর্ণ। সেই সময় বিজ্ঞাপন-প্রচারের জন্য ‘ওয়ান-লাইনার’ এবং স্লোগান লেখার জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। বাংলায় ভাষায় বিজ্ঞাপনে এক বদল এনেছিলেন তিনি।
3
13
পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি ছিল 'হীরের আংটি’। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-এর জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল এই ছবি। যার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী। তাঁর অভিনয় ছবিটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। পাশাপাশি শিশু শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ও দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল।
4
13
ঋতুপর্ণ সকলের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘উনিশে এপ্রিল’-এর হাত ধরে। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও পান। মা-মেয়ের সম্পর্কের জটিল সমীকরণ উঠে এসেছিল এই ছবিতে। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অপর্ণা সেন এবং দেবশ্রী রায়।
5
13
বাংলা চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণর অন্যতম স্মরণীয় ছবি 'চোখের বালি'। এই ছবিতে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঐশ্বর্য রাই বচ্চন। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন এবং টোটা রায়চৌধুরী। পোশাক, বাড়িঘর, সংলাপ, আচার-আচরণ-সবকিছুতেই উনিশ শতকের বাংলাকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরিচালক।
6
13
পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ ২০০৪ সালে 'রেনকোট' ছবির মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, বড় বাজেট বা চমকপ্রদ দৃশ্য নয়, জোরালো গল্প এবং অভিনয় দিয়েও দর্শকের মন জয় করা যায়। ও. হেনরির বিখ্যাত গল্প 'দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই'-এর অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছিল এই ছবি। ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অজয় দেবগন এবং ঐশ্বর্য রাই বচ্চন।
7
13
'দোসর' পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা ছবি। ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি বাংলা সিনেমায় সম্পর্কের জটিলতা ও মানুষের মনের টানাপোড়েনকে এক নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল। প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি এবং কঙ্গনা সেনশর্মার বাস্তবধর্মী অভিনয় ছবির অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
8
13
২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ঋতুপর্ণর 'আবহমান'-এ সামনে আসে সম্পর্কের জটিলতা, অভিমান, ভালবাসা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব। এই ছবিতে অনিকেতের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দীপঙ্কর দে। তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন মমতা শঙ্কর এবং তরুণী অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অনন্যা চট্টোপাধ্যায়।
9
13
এছাড়াও ঋতুপর্ণর ‘অসুখ’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘উৎসব’, 'সব চরিত্র কাল্পনিক'-এর মতো প্রতিটি ছবিই যেন আলাদা স্বাদের। সম্পর্কের জটিলতা, পরিবারের ভাঙাগড়া, নারীর অনুভূতি, ভালবাসা, একাকীত্ব-এসব বিষয় তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরতেন। তাঁর ছবির চরিত্রগুলো এতটাই বাস্তব ছিল যে দর্শক সহজেই নিজেদের সঙ্গে মিল খুঁজে পেতেন।
10
13
সমাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার সাহসও দেখিয়েছিলেন তিনি। সেই কারণে অনেকের কাছে তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, একইসঙ্গে একজন সামাজিক পরিবর্তনের মুখ।
11
13
তাঁর পরিচালিত ছবিগুলি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে। বাংলা সিনেমাকে তিনি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ধরনের গল্প, নতুন ভাবনা এসেছে।
12
13
মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক বিরাট ক্ষতি। তবে শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর শিল্প কখনও হারিয়ে যায় না। আজও নতুন প্রজন্ম ঋতুপর্ণ ঘোষের চিন্তাধারা থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।
13
13
এতগুলো বছর পেরিয়ে গিয়েও বাঙালির মননে সদা জাগ্রত সেলুলয়েডের মরমি পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং একজন অসাধারণ গল্পকার।