আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইসমাইল সাইবারি বিশ্বফুটবলে আজ অনুপ্রেরণার এক নাম। সংগ্রাম, ত্যাগ, স্বপ্ন আর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে যান তিনি। মরক্কো বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচে পেনাল্টি শুট আউটের শেষ শটটা নিলেন সাইবারি। তাঁর গোলে মরক্কো পৌঁছল রাউন্ড অফ ১৬-এ। নেদারল্যান্ডস ছিটকে গেল। যাদের এবার সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা। ফুটবল খেলা হয় মাঠে। মাঠের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ, ভবিষ্যদ্বাণী কাজে আসে না। সাইবারির শান্ত মুখ, পেনাল্টি শট মারতে যাওয়ার আগে বিড়বিড় করে কী যেন বলে যাওয়া, মরক্কোর এই গোলস্কোরার এখন ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। চর্চায় উঠে এসেছে সাইবারির ব্যক্তিগত জীবনের এক হৃদয় ভাঙার গল্প। যা এখন লোকগাথায় পরিণত হয়েছে।
বায়ার্ন মিউনিখে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলারের ট্রান্সফারের আগে ইসমাইল সাইবারি সপ্তাহে মাত্র ১৯,২০০ ইউরো আয় করতেন। সেই সময়ে তাঁর প্রেমিকা নাকি সাইবারিকে বলেছিলেন, ''আমাকে দেখাশোনার মতো সামর্থ্য তোমার নেই। আমার খরচ বহন তুমি করতে পারবে না।''
প্রেমিকার এই কথায় অসম্মানিত সাইবারির কাছে পৃথিবী ভেঙে পড়ার সামিল হয়েছিল। কিন্তু সময় কখনও থেমে থাকে না। সাইবারি নিজের পরিশ্রম, দক্ষতা ও ক্ষমতার জোরে বায়ার্ন মিউনিখে সই করলেন। সেই সময়ে সেই প্রেমিকা সাইবারির জীবনে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। সাইবারি পুরনো সেই ক্ষতের কথা ভোলেননি। সেই সাইবারি আজ জাতীয় সম্পদ।
ছোটবেলায় টেরাসা শহরের এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম সাইবারির। বাবা হাসান ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি। মা ফাতিমা সংসার সামলাতেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। ছেলেবেলা থেকেই সাইবারির জীবনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিল ফুটবল। মাঠে, রাস্তায়, পার্কে ফুটবলই ছিল তাঁর বন্ধু।
২০০৭ সালে অর্থনৈতিক সঙ্কটে সাইবারির পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবার চাকরি চলে যায়, ছোট ব্যবসাও টেকেনি। শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত ভবিষ্যতের আশায় সাইবারির পরিবার চলে যায় বেলজিয়ামে। আন্ডারলেখট, কেআরসি শেঙ্কের যুব অ্যাকাডেমিতে নিজেকে গড়ে তোলার পর ২০২০ সালে তিনি যোগ দেন পিএসভি আইন্ডহোভেনে। সেখানেই শুরু হয় সাইবারির উত্থান। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, গোল করার অসাধারণ ক্ষমত এবং আক্রমণে বহুমুখী দক্ষতা তাঁকে ইউরোপের অন্যতম প্রতিশ্রুতিমান ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, জাতীয় দলেও সাইবারি হয়ে ওঠেন অসামান্য। রবার্তো মার্টিনেজ একসময়ে তাঁকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলতে ডেকেছিলেন। কিন্তু সাইবারির হৃদয়ে ছিল একটাই স্বপ্ন। তিনি মরক্কোর হয়ে খেলবেন। তিনি সেই স্বপ্নকেই বেছে নেন।
চলতি বিশ্বকাপ সাইবারিকে অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে তিন গোল করেছেন। এদিন রাউন্ড অফ ৩২-তে টাইব্রেকারের শেষ শট নিতে এগিয়ে আসেন সাইবারি। চাপ ছিল পাহাড়সম, কোটি সমর্থকের হৃদস্পন্দন যেন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু বড় খেলোয়াড়েরা বড় মুহূর্তেই নিজেদের প্রমাণ করে। সাইবারির গোলে মরক্কো পৌঁছে যায় রাউন্ড অফ ১৬-এ। আবারও ইতিহাসের স্বপ্ন দেখছে অ্যাটলাসের সিংহরা।
সাইবারি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি প্রমাণ করে দিলেন স্বপ্ন সত্যি হয়। সাইবারি আজ মরক্কোর আশা, আফ্রিকার গর্ব, আর ফুটবলবিশ্বের নতুন এক নক্ষত্র।















