আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বকাপের মঞ্চে এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন ভোজিনহা। স্পেনের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে বারের নীচে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অদম্য প্রাচীর।
স্পেনের তারকাখচিত আক্রমণভাগও সেই প্রাচীর ভাঙতে পারেনি। কেপ ভার্দের জালে বল জড়ানোর জন্য একের পর এক আক্রমণ, একের পর এক শট, সবকিছুর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক।
আফ্রিকার ছোট্ট দেশের স্বপ্নের প্রহরী হয়ে প্রতিটি আক্রমণ রুখে দিয়েছেন ভোজিনহা। তাঁর দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা আর অসাধারণ গোলকিপিং দক্ষতা এখন ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁকে নিয়ে চলছে চর্চা।
নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই তিনি এমন এক গল্প লিখেছেন, যা দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবলপ্রেমীদের। হয়তো এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ, কিন্তু এই মঞ্চে তাঁর লড়াই, তাঁর সাহস আর তাঁর অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এখন ভোজিনহা গুগল সার্চে ট্রেন্ডিং, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে তাঁর নাম। কেপ ভার্দের মানুষের কাছে তিনি আর শুধু একজন গোলকিপার নন, তিনি এখন দেশের গর্ব, দেশের জাতীয় সম্পত্তি।
কেপ ভার্দে অনেক দূরের এক দেশ। আমাদের দেশেও একসময়ে এমনই এক ‘ভোজিনহা’ ছিলেন। বিশ্ব ফুটবল তখনও কেপ ভার্দের এই গোলকিপারের নামও শোনেনি, সেই সময়ে এক বাঙালি গোলকিপার নিজের কেরিয়ারের পড়ন্ত বেলায় হয়ে উঠেছিলেন চাইনিজ ওয়াল।
তিনি সন্দীপ নন্দী। বহু যুদ্ধের সাক্ষী বঙ্গসন্তান প্রথমবারের আইএসএলের মহাযজ্ঞে হয়ে উঠেছিলেন দুর্ভেদ্য। নর্থ ইস্ট ও পুণের বিরুদ্ধে মাস্ট উইন ম্যাচে সন্দীপ একাই সব বিষ শুষে নিয়েছিলেন।
কেপ ভার্দের ভোজিনহার মতোই সন্দীপ নন্দীও প্রমাণ করেছিলেন, গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির বয়স নয়, তাঁর সাহস, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতাই আসল পরিচয়।
আইএসএল-এর প্রথম সংস্করণের পরে কেটে গিয়েছে অনেকগুলো বছর। গঙ্গা দিয়েও গড়িয়ে গিয়েছে অনেক জল। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের বিরুদ্ধে ভোজিনহার লড়াই দেখার পরে সন্দীপের সোনালী মুহূর্তগুলো হঠাৎই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কেরালা ব্লাস্টার্সের তৎকালীন সিইও বীরেন ডি সিলভা নস্ট্যালজিক। পুরনো স্মৃতি দিয়ে তিনি মালা গাঁথতে বসেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বীরেন লিখেছেন, ''গত সপ্তাহে ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভাঙেননি, হার মানেননি। আমাদেরও এমন একজন ছিলেন।
আমাদের প্রথম মরশুমে সন্দীপ নন্দীর বয়স ছিল ৩৯। কিন্তু বয়স যেন কখনওই তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যখনই দলের প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি নিজেকে তুলে ধরেন। পুনের বিরুদ্ধে সেই ক্লিন শিট, যা আমাদের প্লে-অফে পৌঁছে দিয়েছিল, ২০১৬ সালের টাইব্রেকারে তাঁর সেই অবিস্মরণীয় পেনাল্টি সেভ--সন্দীপ নন্দী সবসময়ে নির্ভরযোগ্য, সবসময় দলের পাশে।
এই অভিজ্ঞ যোদ্ধারা হয়তো খুব বেশি শিরোনামে আসেননি। তাঁরা শুধু নিজেদের কাজটা নিঃশব্দে করে গিয়েছেন, আর দলের ভরসা হয়ে উঠেছিলেন। আজ তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার দিন। এই অদম্য পুরোনো সৈনিকদের জন্য রইল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।''
ফুটবল আসলে শুধু তারুণ্যের ঝলকানি নয়, এটি অভিজ্ঞতারও খেলা। কখনও কখনও সবচেয়ে বড় মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়ান সেই যোদ্ধারাই, যাঁদের বয়সের অঙ্ক নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ালে বয়স নয়, কথা বলে সাহস, আত্মবিশ্বাস আর বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা।
ভোজিনহা যেমন কেপ ভার্দের স্বপ্নকে আগলে রেখেছেন, তেমনই একসময়ে সন্দীপ নন্দীও কেরালা ব্লাস্টার্সের আশা-ভরসার এক নাম হয়ে উঠেছিলেন।
সন্দীপের মতো নীরব যোদ্ধারা সবসময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে হয়তো থাকেন না, শিরোনামেও তাঁরা হয়তো কদাচিৎ আসেন কিন্তু দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁরাই হয়ে ওঠেন শেষ ভরসা, শেষ প্রহরী।

ইতিহাসে কিছু নাম মনে থেকে যায় তাঁদের লড়াইয়ের গল্পে। সন্দীপ নন্দীর মতো গোলকিপাররা সেই বিরল যোদ্ধা, যাঁরা প্রমাণ করেছেন, একজন প্রহরীর আসল পরিচয় তাঁর বয়সে নয়, তাঁর অদম্য মানসিকতায়।
বিপন্ন দলকে জীবন ফিরিয়ে দিলেও বেচারি শেষপ্রহরীর কপালে জোটে না প্রশংসা। উলটে গোল বাঁচাতে না পারলেই ধেয়ে আসে সমালোচনা। বাকি দশ জনের লড়াই ব্যর্থ হয়। উড়ে আসে কটাক্ষ। রক্তাক্ত হন গোলকিপার।
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই নীরব নায়করা প্রশংসার যোগ্য। বিশ্বকাপ হোক বা আইএসএল--কখনও কখনও গোলরক্ষকের দু'টি হাতই হয়ে ওঠে একটি দেশ বা একটি ক্লাবের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার শেষ আশ্রয়। সেই গোলকিপার কখনও হন ভোজিনহা, কখনও সন্দীপ নন্দী।















