আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে নাটকীয়ভাবে ফাইনালে ওঠার আনন্দের মাঝেই নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে লিওনেল মেসির দল।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের হাতে দেখা যায় একটি ব্যানার, যাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘Las Malvinas son Argentina’s।’ যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’।

এই ব্যানার ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কারণ, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধকে ফুটবলের মঞ্চে তুলে আনার অভিযোগ উঠেছে।

ফলে ফিফার শাস্তির মুখে পড়তে পারে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। কারণ, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী রাজনৈতিক কোনও ইস্যুকে ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরা যাবে না।

আটলান্টায় দ্বিতীয় সেমিফাইনালে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু ম্যাচ শেষে ট্রফির লড়াইয়ের বদলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ওই রাজনৈতিক ব্যানার। ফুটবলাররা ব্যানারটি নিয়ে উদযাপন করেন এবং পরে সেটি মাঠেই রেখে যান।

আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল থেকে শুরু করে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই ম্যাচ সবসময়ই আবেগে ভরপুর।

সেমিফাইনালের আগেই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে ‘মালভিনাস’ নিয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল ইংল্যান্ডকে ‘জলদস্যু’ বলে মন্তব্য করে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেন।

জয়ের পর তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘এটা শুধু আর একটি ম্যাচ ছিল না। ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার। স্টেডিয়ামে ব্যানার আনতে বাধা দেওয়া হলেও, আমরা এটিকে আমাদের রক্ত ও হৃদয়ে বহন করি।’

আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ‘লাস মালভিনাস’ নামে ডাকা হয়। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটেন থেকে প্রায় ৮,০০০ মাইল এবং আর্জেন্টিনা থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে।

ব্রিটেন ১৮৩৩ সালে দ্বীপগুলির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তবে আর্জেন্টিনা বরাবরই এই দ্বীপের সার্বভৌমত্ব দাবি করে এসেছে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়।

সে সময় আর্জেন্টিনায় সেনাশাসন চলছিল এবং দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতেই দ্বীপ পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে ব্রিটেন পাল্টা সামরিক অভিযান চালায়। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রায় ৬৫০ জন সেনা নিহত হন। মৃত্যু হয় ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনার। এছাড়া প্রাণ হারান তিনজন সাধারণ নাগরিকও। শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় আর্জেন্টিনা।

২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে নির্বাচনে অধিকাংশ বাসিন্দাই ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবেই থাকার পক্ষে মত দেন। বর্তমানে দ্বীপে ব্রিটেনের সেনা রয়েছে। যদিও আর্জেন্টিনা এখনও কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে নিজেদের দাবি জানিয়ে চলেছে।

ফিফার আচরণবিধি অনুযায়ী, মাঠে বা স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক ব্যানার, পতাকা বা প্রতীক প্রদর্শন নিষিদ্ধ। এমনকি খেলোয়াড়দের পোশাকের নিচে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বার্তাযুক্ত লেখা বা ছবি থাকলেও তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২০১৪ সালেও স্লোভেনিয়ার বিরুদ্ধে একটি ম্যাচের আগে একই ধরনের ‘লাস মালভিনাস’ ব্যানার প্রদর্শন করায় আর্জেন্টিনাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি ফিফা। সাধারণত ম্যাচ কমিশনার ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পরই সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা। ফলে ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা জরিমানা, সতর্কবার্তা বা অন্য কোনও শাস্তির মুখে পড়ে কি না, সেদিকেই এখন নজর ফুটবল বিশ্বের।