আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডিস্কো মিউজিকের হালকা তাল আর লাল আলোর মায়াবী আঁধারে ঘেরা মায়ামি বিচের 'ক্যাফে প্রিমা পাস্তা'। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লিওনেল মেসি এই রেস্তোরাঁর নিয়মিত খদ্দের হলেও, গত বছরের ১৩ জুলাইয়ের এক নৈশভোজ মায়ামির বুকে তৈরি করেছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। দ্য অ্যাথলেটিক-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিমা পাস্তা স্থানীয়দের কাছে আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু ইন্টার মায়ামিতে মেসির যোগদানের পর এটি এখন খোদ এলএমটেনের পছন্দের রেস্তোরাঁ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। শুধু এই রেস্তোরাঁই নয়, মেসির মায়ামি আগমন বদলে দিয়েছে এক সাধারণ নাপিতের ভাগ্য, আর এক বিশ্বভ্রমণকারী চিত্রশিল্পীকে এনে দিয়েছে তুমুল খ্যাতি।

গত জুলাইয়ে প্রিমা পাস্তায় মেসির আকস্মিক আগমন পুরো রেস্তোরাঁকে চঞ্চল করে তুলেছিল। রেস্তোরাঁর ৩০ বছর বয়সী বারটেন্ডার অ্যাঞ্জেলো অ্যাক্সিওন জানান, মেসি কোনও  আড়ম্বর ছাড়াই সাধারণ মানুষের মতো সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। প্রথমে অন্য গ্রাহকেরা বুঝতেই পারেননি যে তাঁদের পাশে খোদ ফুটবল রাজপুত্র এসে বসেছেন। কিন্তু ভুল ভাঙতেই মেসির সঙ্গে একটু দেখা করার জন্য রেস্তোরাঁর পেছনে ভিড় জমে যায়। 

প্রিমা পাস্তার ৫৭ বছর বয়সী মালিক সিয়া-র সংগ্রহে লেনি ক্রাভিটজ, এরিক ক্ল্যাপটন বা প্রয়াত গুস্তাভো সেরাটর মতো কিংবদন্তি তারকাদের সই করা গিটার রয়েছে। কিন্তু এখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সম্পদটি হল মেসির সই করা একটি গিবসন গিটার। সিয়া স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, মেসি সবসময় ভীষণ শান্ত আর হাসিখুশি থাকেন। গত ১২ বছর ধরে ওঁর পরিবার এখানে আসছে, কোনওদিন কোনও  সমস্যা হয়নি। আর রেস্তোরাঁয় এলে মেসির সবচেয়ে প্রিয় খাবার হল রিকোটা চিজ ও পালং শাক দিয়ে তৈরি পিঙ্ক সসের 'অ্যাগনলোটি রোসো' পাস্তা।

মেসি-জ্বরে ভাগ্য বদলে যাওয়া আরেকজন মানুষ হলেন লুইস আন্দ্রেস রিভেরা, যিনি সামাজিক মাধ্যমে 'এল বোরি বারবার' নামে পরিচিত। ২৯ বছর বয়সী এই পুয়ের্তো রিকান যুবক এখন মেসির ব্যক্তিগত হেয়ার স্টাইলিস্ট বা নাপিত এবং চুল কাটার সময় কান তো ধরতে হবেই যেকোনও ক্ষুরকারকে। মায়ামির উইনউডে তাঁর আধুনিক সেলুনটিতে এখন তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মেসির টিমের সঙ্গে গোপনীয়তার চুক্তি থাকায় রিভেরা অবশ্য এই বিষয়ে মুখ খোলেন না। তবে গত আগস্টে মেসির চুল কাটার পর ওঁর সাথে একটি ছবি পোস্ট করতেই রাতারাতি তারকা বনে যান রিভেরা। শত সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার ফিরিয়ে দিলেও, মোবাইলে মেসির পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলো বন্ধুদের দেখিয়ে গর্ব করতে ভোলেন না তিনি। রিভেরা আবেগঘনভাবে বলেন, মায়ামি ওঁর জীবন বদলে দিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলা থাকলে মায়ামি যে কাউকে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ তিনি নিজেই।

ঠিক একইভাবে ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ভাগ্য খুলে যায় ৪২ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন দেয়ালচিত্র শিল্পী ম্যাসিমিলিয়ানো বাগনাস্কোর। মায়ামির বুকে মেসির সবচেয়ে বড় ফ্রেস্কো বা দেয়ালচিত্রটি এঁকেছেন তিনিই। ইন্টার মায়ামির সহ-স্বত্বাধিকারী ডেভিড বেকহ্যাম নিজে ক্রেনে চড়ে বাগনাস্কোর এই কাজ দেখতে এসেছিলেন, যা নেটপাড়ায় মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বহুতলটির মালিক গুস্তাভো মিকুলিতস্কির পরিকল্পনায় তৈরি এই ম্যুরালে দেখা যাচ্ছে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে হাসিমুখের এক বিশ্বজয়ী মেসিকে। মিকুলিতস্কি বলেন, গত ২০ বছর ধরে মায়ামিতে থাকার সুবাদে তাঁরা জানেন মেসি মানুষকে কতটা আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারেন। মায়ামিতে এখন মেসিকে স্থানীয় কফি শপে আড্ডা দিতে, মেট চিজ খেতে কিংবা বড় ছেলে থিয়াগোর ফুটবল অ্যাকাডেমির বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে দেখা যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল ঈশ্বর এখন এই শহরেরই একজন ঘরের ছেলে, আর তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে মায়ামির এক নতুন রূপকথা।