আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিততে ঠিক কী লাগে? নিখুঁত কৌশল, দক্ষ ফুটবলার, না কি বড় কোচের পরিকল্পনা? সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় এক অদৃশ্য শক্তি। যার নাম বিশ্বাস। নিজের উপরে অগাধ বিশ্বাস।
যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের উপর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস মানুষকে খাদের কিনারা থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ বিশ্বাসই সেই শক্তি, যা অসম্ভবের মধ্যেও সম্ভাবনার পথ দেখায় এবং হার না মানার সাহস জোগায়।
২-০ গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা, হাতে মাত্র ২৩ মিনিট। অধিকাংশ দল এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে হার মেনে নেয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দ্বিধা আসে, পাসের গতি কমে যায়, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের মানসিকতা আলাদা। তারা স্কোরবোর্ডের দিকে তাকায় না। তারা তাকায় সম্ভাবনার দিকে। সময় যতক্ষণ বাকি, ততক্ষণ ম্যাচও বেঁচে থাকে, এই বিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বড় সম্বল।
আটলান্টায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেটাই প্রমাণ করল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মাত্র ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে যেন নতুন জীবন ফিরে পেল দলটি। রোমেরো প্রথম গোল করে ব্যবধান কমানোর পরই বদলে গেল পুরো ম্যাচের ছবি। যে দল এতক্ষণ ভুল করছিল, যাদের শরীরী ভাষা ঝিমিয়ে পড়া দেখাচ্ছিল, তারাই মুহূর্তে আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শরীরী ভাষা পাল্টে গেল, পাসে এল গতি, আক্রমণে এল তীব্রতা। হঠাৎই ‘মোমেন্টাম শিফট' হয়ে গেল। অনেকে হয়তো রেফারিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন। মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। চায়ের পেয়ালায় উঠবে তুফান। কিন্তু আর্জেন্টিনার নাছোড় মনোভাবের প্রশংসা করতে হবে। এদিনটা হয়তো আর্জেন্টিনার সেরা দিন ছিল না। তাদের ফুটবল ছবির মতো সুন্দর ছিল না। মেসি অন্যান্য দিনের মতো মায়াজাল বিস্তার করতে পারেননি। কিন্তু তবুও মিশরের সাজঘরে ঢুকে যাওয়া ম্যাচ কেড়ে নিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। মেসির ভাসানো বল থেকে রোমেরো ২-১ করেন। একটা গোল করে ব্যবধান কমান।
একটি গোল শুধু ব্যবধান কমায় না। তা মানসিকতার পালাবদল ঘটিয়ে দেয়। গোল করা দলের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রতিপক্ষের মনে ঢুকে পড়ে সংশয়। আর সেই সংশয়ই ধীরে ধীরে চাপে পরিণত হয়।
যে দল কিছুক্ষণ আগেও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করছিল, তারাই হঠাৎ রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পিছিয়ে থাকা দল নতুন উদ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
খেলাধুলার ইতিহাসে এমন প্রত্যাবর্তনের গল্প নতুন নয়। শারজায় শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদ-এর ছক্কা হোক কিংবা ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে কার্লোস ভালদেররামা-র নেতৃত্বে কলম্বিয়া-র দুর্দান্ত লড়াই, প্রতিটি ঘটনাই একটাই শিক্ষা দেয়, বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে ম্যাচ জেতা যায় না।
নব্বই বিশ্বকাপের সেই জার্মানি ও কলম্বিয়া ম্যাচের কথা কার্লোস ভালদেররামা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের আগে ভালদেররামা এসেছিলেন কলকাতায়। তখন তিনি সেই বিখ্যাত ম্যাচ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ''জার্মানির বিরুদ্ধে আমরা পিছিয়ে পড়েও বিশ্বাস হারাইনি। আমরা জানতাম ঠিক পারব।'' আর তাই হয়েছিল। ভালদেররামার পাস থেকে লিঙ্কন জার্মানির জালে বল জড়িয়ে ম্যাচ ড্র রেখেছিলেন।
নকআউট পর্বে ভুলের কোনও দ্বিতীয় সুযোগ থাকে না। একটি ভুল বিদায় ডেকে আনতে পারে, আবার একটি সাহসী মুহূর্ত ইতিহাস লিখে দিতে পারে। তাই এই মঞ্চে ট্যাকটিক্স, ফর্মেশন কিংবা ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আর্জেন্টিনা সেই দৃঢ়তারই প্রতীক। ২-০ পিছিয়েও তাদের শরীরী ভাষায় আত্মসমর্পণের ছাপ ছিল না। তারা জানত, প্রথম গোল ম্যাচে ফেরায়, দ্বিতীয় গোল প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে, আর তৃতীয় গোল ইতিহাস সৃষ্টি করে।সময় সময় আর্জেন্টিনাকে দেখে মনে হচ্ছিল এ বুঝি জার্মান। যে জার্মানি বিখ্যাত হার না মানা মনোভাবের জন্য।
ফুটবল বারংবার মনে করিয়ে দেয়, চ্যাম্পিয়ন হতে সবসময় নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কঠিন সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখা, নিজের সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখা এবং শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া আর অতি অবশ্যই ইস্পাত কঠিন মানসিকতা। কেঁপে গেলে চলবে না।
এই দৃশ্য নতুন নয়। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে দিয়েগো মারাদোনা-র আর্জেন্টিনা ২-০ এগিয়েছিল। কিন্তু হার না মানা জার্মানরা ঠিক ২-২ করে দিয়ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হর্হে বুরুচাগা-র গোলেই বিশ্বকাপ গিয়েছিল বুয়েনোস আইরেসে। আজ আটলান্টায় ইতিহাস যেন আবার নতুন রূপে ফিরে এল।
বিশ্বকাপের নকআউট ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই, ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, তা মনেরও খেলা। বিশ্বাস, সাহস এবং হার না মানা মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নদের আলাদা করে দেয়। কারণ শেষ বাঁশি বাজার আগে ফুটবলে পরাজয় বলে সত্যিই কিছু নেই। মেসিরা আরও একবার তা দেখিয়ে দিলেন।















