আর্জেন্টিনা -৩ মিশর-২
(রোমেরো, মেসি, এনজো) (ইয়াসের, জিকো)

আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়ে ব্রাজিলের নেইমার হাপুস নয়নে কেঁদেছিলেন। ছিটকে যাওয়ার বেদনায় চোখের জল লুকোতে পারেননি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও।

আর মঙ্গলবার আটলান্টায় কাঁদলেন লিওনেল মেসি। তবে এই কান্না হারার নয়, জেতার। এই কান্না বেঁচে থাকার। এই কান্না অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার। মেসির সঙ্গে কেঁদেছে গোটা আর্জেন্টিনা, কেঁদেছে ফুটবলবিশ্ব। কারণ, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভেঙে যাওয়া স্বপ্নই আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

হৃদয়ভাঙল মিশরের। চলতি বিশ্বকাপের বড় অঘটন প্রায় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন মহম্মদ সালাহারা। ১৫ মিনিটে ইব্রাহিম বিষ ঢাললেন। বিশ্বজয়ী গোলকিপার এমি মার্টিনেজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন ইব্রাহিমের হোড জালে জড়াচ্ছে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে তিনি। পিছিয়ে পড়ল আর্জেন্টিনা। গোল করার জন্য মরিয়া লিওনেল স্কালোনির ছেলেরা। তালিয়াফিকোকে বক্সের মধ্যে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় নীল-সাদা জার্সিধারীরা। 

গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে লিওনেল স্কালোনির দল। তালিয়াফিকোকে বক্সের মধ্যে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু পেনাল্টি স্পট থেকে গোললাইন, ফুটবলের সবচেয়ে রহস্যময় পথ। সেই পথেই এদিন হারিয়ে গেলেন মেসি। তাঁর শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন মিশরের গোলরক্ষক সোবিয়ের।

যে মেসির নামের সঙ্গে গোল যেন সমার্থক, সেই তিনিই এই বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বার পেনাল্টি মিস করলেন। এমন রেকর্ডও বিরল। মেসি মানেই যেন নতুন রেকর্ড, কখনও গৌরবের, কখনও বিস্ময়ের।

আর্জেন্টিনা জীবন ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করছিল। ডান দিক থেকে ডি পলের ভাসানো সেন্টার থেকে জোরালো হেড দিলেন ম্যাকালিস্টার। কিন্তু মিশরের গোলকিপার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন, জলস্পর্শ করব না আর, চিতোর-রানার পণ, বুঁদির কেল্লা মাটির পরে থাকবে যতক্ষণ...। ম্যাকালিস্টারের হেড বাঁচালেন। কিছুক্ষণ পরে আলভারেজের বাঁ পায়ের পুশও থামিয়ে দিলেন। কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না। আর্জেন্টিনাকে দেখে মনে হচ্ছে না তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। 

May be an image of ‎soccer, football and ‎text that says '‎Mh هن WORLDCUP20 金 10 1ill 17 A6A‎'‎‎

বিরতির পরে আর্জেন্টিনা আরও বিবর্ণ। আরও বিপন্ন। জিকোর অসাধারণ গোল বাতিল হল ফাউল হয়েছিল বলে। সেই জিকোই প্রতিশোধ নিলেন। ৬৭ মিনিটে ২-০ করে যান তিনি। আর্জেন্টিনা ক্রমশ ম্যাচ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। মেসির স্বপ্ন ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করেছে। কিছুই তাঁর ঠিক হচ্ছে না আজ। বল নিয়ে দৌড়চ্ছেন কিন্তু মিশরের ফুটবলারদের পায়ের জঙ্গলে হারিয়ে ফেলছেন বল। ৩৯-এর শরীরটা আর কতক্ষণ টানতে পারে! সেই ঘর্মাক্ত মেসিই হঠাৎ যেন চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্র হয়ে গেলেন। বাঁ পা হঠাৎ জ্বলে উঠল। মিশরের রক্ষণ ভেঙে দিয়ে বল বাড়িয়েছিলেন লাওতারো মার্টিনেজকে। তাঁর হেড বাইরে চলে যায়। তখন কে আর জানত আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখে যাবে। দিনকয়েক আগে এই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধেই কেপ ভার্দে অবিশ্বাস্য লড়াই তুলে ধরেছিল। শেষপর্যন্ত নীল-সাদা জার্সিধারীদের কাছে থেমে যেতে হয় আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দেকে। 

এদিনের আর্জেন্টিনা নস্ট্যালজিক ফুটবলপাগলদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল কেপ ভার্দের কামব্যাকের কথা। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত স্কোরবোর্ড বলছিল ২–০। আর্জেন্টিনার বিদায় যেন সময়ের অপেক্ষা। বিশ্বকাপের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল মেসির জন্যও। গ্যালারিতে উদ্বেগ, মাঠে হতাশা, সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল এক বেদনাময় সমাপ্তির।

কিন্তু মহান ফুটবলারদের গল্প কি এত সহজে শেষ হয়? ৭৯ মিনিটে জাদুকরের মতোই পথ দেখালেন মেসি। তাঁর নিখুঁত সেন্টার থেকে হেডে ব্যবধান কমালেন রোমেরো। মুহূর্তেই বদলে গেল ম্যাচের আবহ। আর্জেন্টিনা ফিরে পেল বিশ্বাস, আর মিশরের চোখে ফুটে উঠল আশঙ্কা।

মাত্র চার মিনিট পর আবারও মেসি-মায়া। দুর্দান্ত এক ফিনিশে নিজেই ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনলেন। ২–২। যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে পাওয়া নতুন জীবন পেল আর্জেন্টিনা। সেই গোলের সঙ্গে আবারও জ্বলে উঠল আর্জেন্টিনার আশা, আবারও উজ্জ্বল হল মেসির বিশ্বকাপের আকাশ। অথচ মেসিই যে শুরুতে পেনাল্টি নষ্ট করে আর্জেন্টিনাকে বিপন্ন করেছিলেন। সেই মেসিই প্রাণ সঞ্চার করলেন।

তবু নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি। অ্যাডেড টাইমের দ্বিতীয় মিনিট। লাওতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রস উড়ে এল বক্সে। ঠিক জায়গায় ছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। তাঁর হেড জড়িয়ে গেল জালে। অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলল আর্জেন্টিনা। এই কারণেই তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পারফরমারদের ছুড়ে ফেলে দিতে নেই। 

মেসিরা দেখিয়ে দিলেন ইমপসিবল ইজ নাথিং। সবই সম্ভব। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের চিত্রনাট্য লিখে বিশ্বকাপে টিকে রইল আর্জেন্টিনা। শ্বাস পড়ছে লিওনেল মেসিরও। যতক্ষণ তিনি বিশ্বকাপে টিকে আছেন, ততক্ষণ বিশ্বকাপের সেনসেক্স বাড়বে।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগী ছবি আটলান্টায়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আর্জেন্টিনা ৩–২ গোলে হারিয়ে দিল মিশরকে। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত হল। আর লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ স্বপ্নও বেঁচে রইল। 

অবিশ্বাস্য ম্যাচে ফিরে সতীর্থদের আলিঙ্গনে ধরা দিলেন মেসি। গ্যালারির দিকে তাকিয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছেন তিনি। কয়েক মিনিট আগেও তাঁর স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছিল। রেফারির শেষ বাঁশির পরে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা ফের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন তাঁদের আদরের লিওকে নিয়ে। 

মেসির চোখের সেই আনন্দাশ্রু যেন বলে দিল, ফুটবলে শেষ কথা বলে না স্কোরবোর্ড, শেষ কথা বলে বিশ্বাস। পিছিয়ে থেকেও জেতার বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত খেলা করছিল মেসিদের বুকে। আর সেই বিশ্বাসের জোরেই আর্জেন্টিনা হারিয়ে দিল মিশরকে।