আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে আরও একবার ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়ে শেষ হাসি হাসল আর্জেন্টিনা। বুধবার আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি মিলিয়ে টানা চার ম্যাচে একই গল্প লিখল বর্তমান গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দে, শেষ ১৬-তে মিশর এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের পর এবার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড—প্রতিবারই লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, আর প্রতিবারই যুদ্ধক্ষেত্রের পোড়খাওয়া সৈনিকদের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা।

ম্যাচের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড যখন ৬০ বছর পর তাদের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় আর্জেন্টিনার চেনা সেই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। লিওনেল মেসির জোড়া অ্যাসিস্টে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে পাশা উল্টে দেন এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজ। মিশরের বিরুদ্ধে শেষ ১৬-র ম্যাচের মতোই আরেকটি মহাকাব্যিক জয় ছিনিয়ে নিয়ে সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল লা আলবিসেলেস্তেরা। মুকুট ধরে রাখার থেকে এখন তারা মাত্র এক ধাপ দূরে।

ম্যাচ শেষে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, "আমি সত্যিই ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দেশ এবং মানুষের জন্য কী যে এক আনন্দ! সেদিনই বলেছিলাম যে এই দলটা আমাকে অবাক করতে কখনও ক্লান্ত হয় না। আজকের পর মানুষকে এটা বোঝানো খুব কঠিন যে এই খেলোয়াড়রা আসলে কী করতে পারে। এটা অবিশ্বাস্য। আমরা সত্যিই অনন্য, আর এটা কোনও  অহংকার নয়—মনের গভীর থেকে বলছি। আজকের ম্যাচে আমাদের সমর্থকরাও জয়ের জন্য ভীষণ সাহায্য করেছে, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।"

খেলোয়াড়দের এই লড়াকু মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে স্কালোনি তাঁদের 'ইন্দিওস' (আমেরিকার আদিবাসী বা রেড ইন্ডিয়ানদের বোঝাতে ব্যবহৃত স্প্যানিশ শব্দ) বলে সম্বোধন করেন। অবশ্য ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে শব্দটির নেতিবাচক অর্থ তৈরি হতে পারে বুঝতে পেরে দ্রুত নিজের ভুল সংশোধনও করে নেন তিনি। স্কালোনি ব্যাখ্যা করেন, "আমি জানি ওরা কেমন। ওরা ভীষণ লড়াকু আর হিংস্র, তবে সেটা সবচেয়ে ইতিবাচক অর্থে। ওরা এমন পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে কোনও  কিছুকে ভয় পাওয়ার অবকাশ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ওরা সব জায়গায় সেরা হয়ে লড়াই করেছে এবং সবাই ওদের থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করত। তাই বাড়তি দায়িত্বের চাপ ওদের কখনোই কাবু করতে পারে না।"

পরে সংবাদ সম্মেলনে ম্যাচের রণকৌশল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আর্জেন্টাইন কোচ জানান, তাঁর দল চাপের মুখেই সবচেয়ে সেরা ফুটবল খেলে। যখন দল চাপে থাকে এবং প্রতিপক্ষ সামান্যতম ভুল করে, তখনই আর্জেন্টিনা রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, গোলপোস্টের সামনে তখন যেন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কাজ করে, যা বলকে ভেতরের দিকে টেনে নেয়। ইংল্যান্ড গোল করার পর থেকে ম্যাচের শেষ ৪০ মিনিট ফুটবল কাকে বলে তার আসল প্রদর্শনী দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। শুধু কৌশল বা সুন্দর ফুটবল নয়, ছোটবেলায় শেখা ফুটবলের সবটুকু আবেগ আর লড়াইয়ের গল্পই যেন ফুটে উঠেছিল আটলান্টার মাঠে। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর দাঁতে দাঁত চেপে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচটি ধরে রেখেছিল আর্জেন্টিনা, যা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব।