আজকাল ওয়েবডেস্ক: খেলার মাঠের সবুজ গালিচায় যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে আনন্দে ভাসাতেন, এক লহমায় আকাশে মিলিয়ে গেছে তাদের প্রাণ। ফুটবল ইতিহাস যেমন বহু আনন্দের উপাদানে ঠাসা, তেমনই কিছু কালো অধ্যায় এই সুন্দর খেলাটিকে বারবার কাঁদিয়েছে। তেমনই পাঁচটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার গল্প আজ উঠে এল স্পোর্টস ট্র্যাজেডির পাতায়, যা চিরতরে বদলে দিয়েছিল ফুটবলের মানচিত্র।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক এক অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশে এয়ার ট্রাফিকের চরম গাফিলতিতে মাঝ-আকাশেই ধাক্কা খায় দুটি যাত্রীবাহী বিমান। এই ভয়াবহ সংঘর্ষে বিমানে থাকা ১৭৮ জন যাত্রীর প্রত্যেকেই প্রাণ হারান। আর সেই সঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে যায় উজবেকিস্তানের তৎকালীন সেরা ফুটবল ক্লাব ‘এফসি পখতাকোর তাশখন্দ’-এর পুরো দলটি। মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই ১৭ জন খেলোয়াড় ও স্টাফের এমন আকস্মিক চলে যাওয়া কোনওদিন ভুলতে পারেনি ফুটবল বিশ্ব।

এর ঠিক এক দশক পর, ১৯৯৩ সালে আরও একটি ট্র্যাজেডি স্তব্ধ করে দেয় আফ্রিকান ফুটবলকে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচ খেলতে বিমানে চেপেছিলেন জাম্বিয়া জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যরা। কিন্তু গ্যাঁবনের লিব্রেভিলে জ্বালানি নেওয়ার পর উড়ানের কিছুক্ষণের মধ্যেই জাম্বিয়ার সামরিক বাহিনীর সেই বিমানটি আটলান্টিক মহাসাগরে ভেঙে পড়ে। আরোহী ৩০ জনের কেউই বাঁচেননি, যাদের মধ্যে ছিলেন ১৮ জন প্রতিভাবান জাম্বিয়ান ফুটবলার। এই এক দুর্ঘটনাই দেশটিকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে দেখার স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।

আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হয় ২০১৬ সালে। ব্রাজিলের রূপকথার দল ‘চ্যাপেকোয়েন্স’ তখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যাচের মুখোমুখি হতে কলম্বিয়ার মেদেলিনে যাচ্ছিল। কোপা সুদামেরিকানার ফাইনাল খেলতে চাওয়া সেই দলটিকে বহনকারী বিমানটি ল্যান্ডিংয়ের মাত্র কয়েক মিনিট আগে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে পাহাড়ে ধাক্কা মারে। ৭৭ জন আরোহীর মধ্যে ৭১ জনই প্রাণ হারান, যার মধ্যে ছিলেন ক্লাবের প্রায় সমস্ত ফুটবলার ও কর্মকর্তা। মাত্র তিনজন ফুটবলার অলৌকিকভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও বেঁচে ফিরেছিলেন, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে জল এনে দেয়।

ফিরে যাওয়া যাক আরও অতীতে, ১৯৪৯ সালের ইতালিতে। সে দেশের ফুটবলের অহংকার ‘তোরিনো এফসি’ দলটিকে বহনকারী একটি বিমান ঘন কুয়াশা আর ঝোড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে তুরিনের কাছে সুপর্গা ব্যাসিলিকার দেওয়ালে সরাসরি ধাক্কা মারে। বিমানের ৩১ জন আরোহীর সবাই মারা যান, যার মধ্যে ছিলেন ১৮ জন খেলোয়াড়। তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ক্লাব দলটিই ছিল ইতালির জাতীয় দলের মূল মেরুদণ্ড। এই ধাক্কা সামলাতে ইতালীয় ফুটবলের বহু বছর সময় লেগেছিল।

পঞ্চম আরেকটি ট্র্যাজেডি নাড়া দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার ফুটবলকে, ১৯৮৭ সালে। পেরুর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ‘আলিয়াঞ্জা লিমা’র ফুটবলাররা ম্যাচ খেলে যখন চার্টার্ড বিমানে ফিরছিলেন, তখন গন্তব্যের খুব কাছে এসে পেরুভিয়ান নৌবাহিনীর সেই বিমানটি প্রশান্ত মহাসাগরে ভেঙে পড়ে। বিমানে থাকা ৪৩ জনের মধ্যে ১৬ জন ফুটবলার এবং কোচিং স্টাফসহ সকলেই সলিলসমাধি বরণ করেন। অবিশ্বাস্যভাবে, সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে একমাত্র পাইলট ছাড়া আর কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই কালো দিনগুলো প্রমাণ করে, মাঠের জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে জীবনের খেলা কতটা অনিশ্চিত।