আজকাল ওয়েবডেস্ক: একসময়ে সবুজ ঘাসের বুকে দৌড়াতো বাংলা। পায়ের ছন্দে, গ্যালারির গর্জনে, ফুটবলের সঙ্গে মিশে যেত বাংলা ভাষা। জাতীয় দলে বাংলার  ফুটবলারের প্রতিনিধিত্ব ছিল দেখার মতো। ফুটবল হয়ে উঠত আবেগের এক নাম।

কলকাতা ময়দানের বাতাসে ভেসে বেড়াতো অসংখ্য বাঙালি ফুটবলারের গল্প, তাঁদের স্বপ্ন। তাঁদের প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল ছিল নিজের মাটির প্রতি নিবেদন। তাঁদের দেখে অনুপ্রাণিত হতো বাকিরা। 

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে অনেককিছু। জাতীয় দলে বাঙালি ছেলেদের প্রতিনিধিত্ব কমেছে। বড় ক্লাবের জার্সিতে এখন আর আগের মতো ভিড় নেই বাঙালি ছেলেদের। কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে সেই স্বাভাবিক উপস্থিতি, সেই আত্মবিশ্বাসী আধিপত্য। 
এই নিভু-নিভু আলোর মধ্যেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন সৌভিক চক্রবর্তী। একরোখা এক বিশ্বাসের মতো। 

ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা। সবুজ ঘাসে সৌভিকের প্রতিটি দৌড় যেন জিজ্ঞাসা করে যায়, ''আমরা কি আবার ফিরব?" তাঁর ফুটবল, লাল-হলুদ জার্সিতে তাঁর ঘাম ঝরানো যেন উত্তর দিয়ে যায়, "হ্যাঁ, যদি স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখা যায়।"

আমার কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আজও ভাল লাগে--কবীর সুমনের সেই বিখ্যাত গানের লাইন যেন মনে পড়ে যায় সৌভিক চক্রবর্তীর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই দেখতে দেখতে। 

মাঠের মধ্যে সৌভিক একা নন। তাঁর সঙ্গে দৌড়য় এক সময়ের গৌরব, এক হারানো যুগের প্রতিধ্বনি। হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু সেই আগুন এখনো নিভে যায়নি—শুধু অপেক্ষা করছে আবার দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার। 

সৌভিক চক্রবর্তী সেই স্বপ্নের নাম। ১৮ বছরের কাছাকাছি হয়ে গেল তাঁর পেশাদার ফুটবল। ডার্বি হোক বা অন্য ম্যাচ, সৌভিক চক্রবর্তী মানেই লড়াই-লড়াই আর লড়াই। অকুতোভয় এক ফুটবলার। 

তাঁকে দেখে ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবলার অর্ণব মণ্ডল বলেন, ''ভারতীয় দলে, বয়সভিত্তিক দলে বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা ক্রমাগত কমে আসছে। এই ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা দেখলে খারাপ লাগে। কেন? কেন? এই কেন-র উত্তর পাই না। তিন প্রধানেও তো কমে আসছে বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা। হাতে গোনা যে ক'জন রয়েছে, তাদের মধ্যে সৌভিক অন্যতম। প্রজন্মকে ধারণ করতে হয়। তার লড়াই, তার গল্প প্রজন্মের থেকে প্রজন্মে যাতে ছড়িয়ে পড়ে, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের। মাঠে সৌভিককে দেখেছি লড়াই করতে। সেই লড়াই অনেককেই অনুপ্রাণিত করে যাবে। ইস্টবেঙ্গল সমর্থক থেকে শুরু করে সবারই দায়িত্ব সৌভিকের মতো খেলোয়াড়দের পাশে থাকা। তাদের উৎসাহিত করে যাওয়া।'' 

গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হয়ে গিয়েছেন সৌভিক চক্রবর্তী। যার সঙ্গে কোনও ভাবেই হয়তো তিনি জড়িত নন। ফুটবল বডি কন্ট্যাক্ট গেম। অনুশীলন হোক বা ম্যাচ, চোট আঘাত খেলারই অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কাউকে ইচ্ছাকৃত ভাবে আঘাত করেন না। এশিয়ান অল স্টার খ্যাত গোলকিপার অতনু ভট্টাচার্য বলছেন, ''মাঠে সৌভিক একজন ফাইটার। দল অন্ত প্রাণ। হেরে যাওয়ার বান্দা নয়। পরের প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাতে পারে সৌভিকের মতো ফুটবলাররাই।'' 

একই নিঃশ্বাসে অতনু বলছেন, ''এটা ফুটবল—সব সময় সহজ আর নরমভাবে ট্রেনিং করা যায় না। চোট আঘাত খেলারই অঙ্গ। আমাদের সময়ে অনুশীলনেও কেউ কাউকে ছাড়ত না। কম্পিটিশন অনেক বেশি ছিল। অনেকেরই লেগে যেত চোট। তার জন্য কখনও কেউ মনে করেনি যে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করেছে। আমরা খেলোয়াড়, আমরা এগুলো বুঝতে পারি। সমর্থকদেরও বোঝা উচিত। ফুটবলারদের আবেগটাও ধরা উচিত তাদের।'' 

অতনুর সুরে অর্ণব বলছেন, ''আমাদের সময়ে অনুশীলনে হাতাহাতিও হয়েছে। জরিমানা পর্যন্ত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারকে। একটা কথা মনে রাখতে হবে দলের জন্য প্রত্যেকটি খেলোয়াড় নিবেদিত প্রাণ। সৌভিকের মতো ছেলে তো তাই। সব সময়ে নিজের সেরাটা দিতে চায়। নিজেকে নিংড়ে দেয় মাঠে। তার ফলে সৌভিক নিজে যেমন চোখে পড়ে যায়, তেমনই দলও উপকৃত হয়। ক্লাবের জার্সিতে সৌভিকের মতো ফুটবলাররা ঘাম ঝরাচ্ছে, নিজেদের নিংড়ে দিচ্ছে, দিনের শেষে প্রিয় সমর্থকদের কাছ থেকে তারাও ভালবাসা চায়, চায় শ্রদ্ধা, চায় সম্মান।'' 

সবশেষে একটা কথা বলাই যায়, ফুটবল শুধু স্কোরলাইনের খেলা নয়। এটা এক অনুভূতিরও গল্প। যাঁরা মাঠে নামেন, তাঁরা শুধু নিজেদের জন্য খেলেন না। খেলেন এক ক্লাবের জন্য, এক ইতিহাসের জন্য, এক অদৃশ্য উত্তরাধিকারের জন্য।

সৌভিক চক্রবর্তী তাই শুধু একজন ফুটবলারের নাম নয়, তিনি এক সেতুবন্ধ—অতীতের গৌরব আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। 

হয়তো আবার একদিন সবুজ ঘাসের বুকে দৌড়বে অনেকগুলো বাংলা নাম। গ্যালারিতে ফিরবে সেই চেনা গর্জন। আর সেই দিনের পথটা তৈরি হচ্ছে আজ সৌভিকদের ঘাম, লড়াই আর অবিচল বিশ্বাসে।

কারণ স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে। আর যতদিন সেটা বেঁচে থাকবে, ততদিন বাংলা ফুটবলের গল্পও থামবে না।