আজকাল ওয়েবডেস্ক: "বাতাসটা যেন আজও গায়ে লেগে আছে। বাইকের প্রতিটি গিয়ার বদলের সঙ্গে মনে হচ্ছিল আমিও পথের অংশ। এতদিন শুধু অন্যের মুখে পাহাড়, নদী, দীর্ঘ রাস্তার গল্প শুনেছি। আজ প্রথমবার সেই গল্পগুলো নিজের শরীর দিয়ে অনুভব করলাম।"
কথাগুলো বলছিলেন চন্দন মাইতি। ভারতের প্রাক্তন দৃষ্টিহীন ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। ক্রিকেট মাঠে দেশের হয়ে লড়েছেন, আজ তিনি একজন শিক্ষক। কিন্তু রবিবারের এই মোটরসাইকেল সফর তাঁর কাছে ছিল জীবনের এক অন্যরকম বিজয়।
বাংলায় এই প্রথম বিয়ন্ড সাইট ও যাযাবর বাঙালির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হল এক মোটরসাইকেল রাইড।
সাঁতরাগাছি থেকে কোলাঘাট পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন বাইকারের সঙ্গে সমান অংশীদার হয়ে যাত্রা করেন ৮ জন দৃষ্টিহীন বন্ধু। কেউ কারও যাত্রী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন একে অপরের সহযাত্রী।
এই আটজনের মধ্যে ছিলেন প্রসেনজিৎ। সমাজের কুসংস্কার, অবহেলা আর অজ্ঞতার কারণে তিনি কোনওদিন স্কুলে পড়ার সুযোগই পাননি।
রাইড শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি, "ছোটবেলা থেকে সবাই বলেছে, আমি কিছুই করতে পারব না। আজ প্রথমবার মনে হল, আমিও অন্য সবার মতো পথ চলতে পারি। আজ আমি শুধু বাইকে চড়িনি, নিজের ভয় আর সমাজের তৈরি সীমাবদ্ধতাকেও পিছনে ফেলে এসেছি।"
রাস্তার হাওয়া, ইঞ্জিনের শব্দ, গিয়ার বদলের ঝাঁকুনি, বাঁকের উত্তেজনা, সহযাত্রীর সঙ্গে গল্প, চোখে না দেখেও জীবনের এই অনুভূতিগুলো তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিল এক নতুন পৃথিবী।
বাইকপ্রেমীদের কাছেও ছিল জীবনের অন্যতম সেরা রাইড। যাযাবর বাঙালি শুধু একটি বাইকার গ্রুপ নয়, বাংলার অন্যতম ভ্রমণপিপাসু বাইকার কমিউনিটি। লাদাখ, অরুণাচল প্রদেশ, স্পিতি, উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম পথ, বহু অভিযানের সাক্ষী তাঁরা।
তবুও এই সফরের শেষে তাঁদের কণ্ঠে ছিল অন্যরকম আবেগ।
কমিউনিটির মেন্টর সৌম্যজিৎ বোস বলেন, "আমরা লাদাখ গিয়েছি, অরুণাচল গিয়েছি, হাজার হাজার কিলোমিটার বাইক চালিয়েছি। কিন্তু এত আনন্দ, এত তৃপ্তি কোনও রাইড আমাদের দেয়নি। আজ বুঝলাম, গন্তব্য নয়, মানুষের মুখের হাসিই আসল ভ্রমণ।"
আরেক মেন্টর অর্পণ সিংহ রায় বলেন, "আজ আমরা প্রত্যেকে অনেক সমৃদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরছি। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগের পাশে আমরা সবসময় থাকব।"
বিয়ন্ড সাইটের প্রতিষ্ঠাতা বাপন মোজাফ্ফর আহমেদ বলেন,"দৃষ্টিহীন মানুষদের আমরা প্রায়ই সাহায্যের চোখে দেখি। কিন্তু তাঁরা সাহায্য নয়, সুযোগ চায়। তাঁরা করুণা নয়, সমান অধিকার চায়। আজকের রাইডে কেউ কাউকে বহন করেনি, সবাই একে অপরকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। যদি একজন দৃষ্টিহীন মানুষ বাতাস, পথ আর স্বাধীনতার আনন্দ অনুভব করতে পারেন, তাহলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও নিশ্চয়ই বদলাতে পারে। এটাই বিয়ন্ড সাইটের স্বপ্ন।"
বিয়ন্ড সাইটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুমিত চৌধুরী বলেন, "আজকের দিনটা একটা কর্মসূচির সাফল্য নয়, এটা একটা মানসিকতার পরিবর্তনের শুরু। আমরা চাই এই উদ্যোগ শুধু বাংলায় নয়, সারা দেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠুক।"
৩০টি মোটরসাইকেল, ৮ জন দৃষ্টিহীন সহযাত্রী, একটাই রাস্তা, কিন্তু সেই যাত্রা শুধু সাঁতরাগাছি থেকে কোলাঘাটে শেষ হয়নি। সেই যাত্রা হয়তো শুরু করেছে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরও মানবিক এক সমাজের পথচলা।
















