প্রতীক্ষা ঘোষ

সমাজের দুই প্রান্তিক মানুষ। নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তাঁরাই মুখোমুখি হন ‘পুনে অগ্নিমিত্র’ দলের প্রযোজিত নাটক ‘প্রান্তিক’-এ। ঝুলন মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়, ভাস্বর মুখোপাধ্যায় রচিত এই নাটকে একক অভিনয় করেছেন দোলনচাঁপা সরকার। যখন আজকাল ডট ইনের পক্ষ থেকে অভিনেত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হল, প্রতিটি চরিত্রকে অনায়াসে মঞ্চায়িত করা যেতে পারত। তবে কেনও একক অভিনয়ের প্রয়োজন হল? অভিনেত্রীর উত্তরে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অনায়াস আয়না সামনে এল। এই পুরুষ চালিত সমাজে পুরুষ বাদে নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আসলে একা। প্রান্তিক। এঁদের কথা বলার জন্য জীবনে, যুদ্ধে, বুদ্ধিতেই শুধু নয়, মঞ্চেও একা হতে হয়। তাই একক নাটক। নারীর একেকীত্বের সাথে ক্লীবের একাকীত্ব, মিলে মিশে প্রান্তিক হয়ে যায় মানুষ। সেই গল্প নাটকের রূপ নিলে তাকেও এককই হতে হয়। দর্শকের চোখে চোখে সেই প্রান্তিক একাকীত্ব সর্বজনীন হয়ে যায়, তবু তাঁরা প্রান্তিকই থেকে যায়। 

 

নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সংসারী নারী। বর, বাচ্চা, শাশুড়িকে নিয়ে তার আপাতস্বাভাবিক মধ্যবিত্ত জীবন। কিন্তু নাটক শুরু হতেই বোঝা যায়—এই সংসার আসলে একটি কাঠামো, যেখানে সে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং সব সিদ্ধান্ত সহ্য করে নেওয়ার মানুষ। পরিচারিকা চলে যাওয়ার মতো একেবারেই দৈনন্দিন একটি ঘটনা থেকে নাটকের ভাঙা গড়া শুরু হয়। গৃহস্থালির প্রয়োজন তাকে বাধ্য করে নতুন কাজের লোক খুঁজতে। কিন্তু যাঁরা যাঁরা আসেন, তাঁদের কাউকেই ঠিক পছন্দ হয় না কাররই। মানে কর্তা কর্ত্রী কাররই। এই ‘পছন্দ’ শব্দটি আসলে একটা সামাজিক ছাঁকনি। পছন্দের মাপকাঠিতে মানুষটি কতখানি কাজ করতে পারেন সেটা বিচার্য নয়। বিচার্য একমাত্র, সমাজের চোখে মানুষটির অবস্থান। ফলত, এই ছাঁকনির সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন এক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। নাটকটি এখানেই তার আসল প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—কাজ চাওয়াটাই কি অপরাধ? নাকি অপরাধটা হচ্ছে সমাজের চোখে ‘অস্বাভাবিক’ হওয়া? এই চরিত্রটি ভিক্ষা নয়, কাজ চান। তিনি বলেন, তাঁর ঘরে বাচ্চা আছে, তাদের খাওয়াতে হবে। এই সংলাপটি শুধু একটি চরিত্রের নয়, গোটা প্রান্তিক সমাজের আত্মপক্ষ সমর্থন। তবুও, কাজ মেলা ভার। ঘরের বাচ্চাকে কী খাওয়াবেন সেই প্রশ্ন অন্যের কাছে অর্থহীন। কিন্তু মায়ের কানে এই কথা যন্ত্রণা হয়ে বিঁধে যায়। নাটকের মূল নারী চরিত্রের মায়া হয়। নানা ঘটনার পরে তিনি এই কিন্নর মানুষটিকে কাজে রাখতে চান। কিন্তু সংসারের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো সঙ্গে সঙ্গে মুখোশ খুলে ফেলে। বর ও শাশুড়ির কুসংস্কারের তোপ এসে পড়ে। “ঘরে হিজড়ে ঢুকলে গেরস্থ ছারখার হয়ে যাবে বলে দিলাম…” বাইরের লোকের সামনে অপমানিত হতে হয় ঘরের সেই সংসারী নারীকেও। নিজের ঘরেই তাঁকে শুনতে হয়, “কার অনুমতিতে তুমি এই হিজড়েটাকে কাজে রাখলে? আমার বাড়িতে ও কাজ করবে না…” দীর্ঘ প্রেম শেষে বিয়ে। বিয়ের এত বছর বাদে, নিজের হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসারে, সেই নারীকে শুনতে হয়, এই বাড়ি তাঁর নয়। তাঁর সহধর্মীর। একার। যেমন পুরুষতন্ত্রের ধারণা, এই সমাজ, পুরুষদের একার। ঠিক তেমনই, সেই বাড়িও, পুরুষটির একার। 

 

সংলাপে সংলাপে একক নাটক, একার থেকে সর্বজনীন হয়ে উঠতে সময় লাগল না বিশেষ। সূক্ষ্মতার সঙ্গে নাটকটি প্রতি সংলাপে মানুষকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সমাজকে দোষ দেয় মানুষ, অথচ মানুষে মানুষে মিলিয়েই তৈরী সমাজ। তাহলে নিজেদের ভাবনা বদলালে সমাজে বদল ঘটবে। তাহলে আমরা বদলাতে চাইছি না? কিন্তু কেন? এই নাটক কাউকে দুষ্ট লোক বলে দেগে না দিয়ে, দর্শককেই জুড়ে নিয়ে, সমাজের আয়নায় নিজের ভাবনার প্রতিফলন দেখতে বাধ্য করে। 

মঞ্চ একার। নাটক একার। তবুও অভিনেত্রী কী অসীম দক্ষতায় একার অভিনয়ে এত চরিত্র নিয়ে এসেছেন। তিনি অনবদ্য দক্ষতায় একাধিক মানসিক অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনও তিনি অসহায় গৃহবধূ, কখনও দ্বিধাগ্রস্ত মা, কখনও নীরব প্রতিবাদী মানুষ। বিশেষ করে নবান্নের প্রেক্ষাপট নাটকে এক গভীর তাৎপর্য যোগ করে। উৎসব, আনন্দ, নতুন শস্য—সব কিছুর মাঝেই একজন মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়ার নৈতিক দ্বন্দ্ব দর্শকের ভেতর প্রশ্ন জাগায়: উৎসবের উন্মাদনা, কাকে ঘিরে? অতিথি যদি নারায়ণ হয়, তবে তাকে তাড়িয়ে নবান্নের উৎযাপন আনন্দময় কীভাবে হবে? 

 

কিন্নর মানুষটির বিদায়বেলাটিও নাটকীয় বেশ। তিনি নারীকে জানান, “মা, আমি তোমার বাড়িতে তোমাকে অপমানিত হতে দেখছি। চুপ করে থেকো না মা। জবাব দাও।” তিনি চলে যান। কিন্তু নিজেকের আর নারীকে একই প্রান্তিক স্তরে রেখে যান। পুরুষতন্ত্রের একই সুতোয় গেঁথে যাওয়া দুই প্রান্তিক চরিত্র। নারী ও কিন্নর। 

 

এই নাটক কোনও সহজ সমাধান দেয় না। সহজ বাস্তবের সামনে এনে হাত ছেড়ে দেয়। প্রান্তিক মানুষের প্রতি সমাজের উদাসীনতার সামনে এসে শেষ হয় সে। ক্ষমতার বাইরে থাকা সমস্ত মানুষের যন্ত্রণাদের কথাদের নিয়ে, দুই শোষিত মানুষের যৌথ অপমানের অভিজ্ঞতায় ভর করে, একক অভিনেতার শরীরে বয়ে চলা এই নাটক আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমরা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছি?