বুড়োশিব দাশগুপ্ত

ইরান ভেনেজুয়েলা বা ইরাকের মতো নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের শক্তিকে ছোট করে দেখে ‘ঐতিহাসিক’ ভুল করে ফেলেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে রাতারাতি আটক করা হয় এবং সাদ্দাম হুসেনকে (জর্জ বুশ) সরিয়ে দেওয়া হয় এক মাসের মধ্যে। ইরানে কিন্তু এক খামেনেই এর পরবর্তীতে আরও খামেনেইরা এসেছেন। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণের ইরান দ্বারা প্রতিশোধ ছিল মারাত্মক। পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত আমেরিকার সব ঘাঁটি ইরানি বাহিনীর দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছে।  নানা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সামরিক ঘাঁটিগুলির স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে কয়েক বছর সময় লাগবে। পশ্চিম এশিয়ার মানচিত্রের অন্য প্রান্তে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ইজরায়েল কখনও কল্পনাও করেনি যে, ইরানি ড্রোন এতটা নৃশংসভাবে আক্রমণ করবে।

আমেরিকার টেক্সাসের একটি তেল শোধনাগারে এবং জর্জিয়ার একটি আদালতে পর পর বিস্ফোরণ ইরানের চরমপন্থী সংগঠনেরই একটি শাখা, ‘স্লিপিং সেল’ দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ট্রাম্পের ঘুম নষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রায় সব ক’টি প্রদেশে মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। ট্রাম্পের ‘শান্তির প্রস্তাব’ কাজে লাগেনি। পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে ইরান বিশ্বের তেল এবং গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত করেছে। আমেরিকার কোনও হুঁশিয়ারিতে কাজ হচ্ছে না। পাকিস্তান মধ্যস্থতা করতে চেয়েছে, তাতেও ফল মেলেনি।

ইরান দাবি করে তারা ভারতের বন্ধু। আমেরিকা এবং ইজরায়েলও তাই। ভারতের জন্য এ এক কঠিন কূটনীতি। যুদ্ধের প্রাথমিক প্রভাবে ভারতে পড়েছে রান্নার গ্যাসের সঙ্কটের মাধ্যমে। রান্নার গ্যাস (এলপিজি), পেট্রল এবং ডিজেল- ভারতের প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯০ শতাংশ আমদানি করা হয় মূলত পশ্চিম এশিয়া থেকে। কেন্দ্র তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করে বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ নিষিদ্ধ করে দেয়। দেশের বেশিরভাগ হোটেল এবং রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে যায় অথবা মেনুতে কাটছাঁট করা হয়েছে। গৃহস্থালীর গ্যাস পরিমিত করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও পেট্রল এবং ডিজেলের দাম এখনও বাড়েনি (সম্ভবত পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের জন্য থেমে রয়েছে)। যুদ্ধে বিরতি না হলে দামে লাগাম টানা সম্ভব হবে না। সরকার আবগারি শুল্ক কমিয়েছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারের দাম অপরিবর্তিত রাখতে তেল সংস্থাগুলিকে তুষ্ট করার জন্যই এটি করা হয়েছে। উত্তেজনা প্রবল, কারণ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বলছেন যে দেশকে অতিমারির সময়ের মতো প্রস্তুত থাকতে হবে।

যুদ্ধের প্রভাব ভারতীয় জীবনে গভীরভাবে গেঁথে যাবে। সারের দাম বাড়ছে,  খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে তৈরি সিরিঞ্জ এবং অন্যান্য সরঞ্জামের দাম বাড়বে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশপথ এড়াতে বিমান সংস্থাগুলিকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। যার ফলে যাত্রা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত ভারতীয়দের পাঠানো রেমিটেন্স (যা মূলত ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখে) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত জিডিপি  স্থিতিশীল ছিল, সেখানে মুদ্রাস্ফীতির কালো মেঘ ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। ভারতীয় শেয়ার বাজার এখনও যুদ্ধের ধাক্কা থেকে সেরে ওঠেনি।

এই যুদ্ধে হয়তো কেউই জয়ী হবে না। এটি রাশিয়া-ইউক্রেন এবং প্যালেস্তাইনের মতো অন্যান্য যুদ্ধকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধ এক রকম অবশ্যম্ভাবীই ছিল। আরব ও ইজরায়েলিদের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত (পশ্চিমা সমালোচকদের মতে ইরান একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালাচ্ছিল) এখন প্রকাশ্যে এসেছে। এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ থেকে, যখন প্যালেস্তাইন থেকে ইজরায়েলকে আলাদা করা হয়। এটিকে আরব দেশগুলি ‘তাদের ভূমি’ বলে দাবি করে। আমেরিকা বরাবরই ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইরান প্যালেস্তিনিয়দের হয়ে একটি ‘ছায়া যুদ্ধ’ চালিয়ে গিয়েছে। এখন প্রকাশ্যে আসায় এই আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রভাব ফেলেছে বিশ্বে। কিন্তু আশঙ্কা হল, এটি যেন আরও একটি বিশ্বযুদ্ধে পরিণত না হয়।