আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০০২ সালের ১১–১২ এপ্রিল ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এক গভীর সংকটের মুহূর্ত। সামরিক বিদ্রোহ, কর্পোরেট মিডিয়ার বিভ্রান্তি ও ওয়াশিংটনের ছায়ায় গড়ে ওঠা অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে বলিভারিয়ান বিপ্লব। এই নাটকীয় সন্ধিক্ষণে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ভূমিকা শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও আদর্শগত দিক থেকেও ছিল নির্ণায়ক।

২০২২ সালের ১২ এপ্রিল ভোররাতে, দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর, ফিদেল কাস্ত্রো ফোনে কথা বলতে পারেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সঙ্গে। তখন চাভেজ মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে আটক, চারদিকে সামরিক চাপ, আর পেদ্রো কারমোনা এস্তাঙ্গার নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান সরকার গঠনের ছক কষা হচ্ছে যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনের অভিযোগ ছিল।

চাভেজ ফিদেলকে জানান, তাঁর পাশে তখন মাত্র “২০০-৩০০ জন চরম ক্লান্ত সৈনিক”। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে ফিদেল তাঁকে পদত্যাগের  পথ থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন। চাভেজ পরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ফিদেলের স্পষ্ট বার্তা ছিল-“নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে ফেল না। পদত্যাগ করে দিও না। এই লড়াই এখানেই শেষ নয়। নিজেকে বাঁচাও, জনগণকে বাঁচাও।”

ফিদেল কাস্ত্রোর মূল্যায়ন ছিল, সেই মুহূর্তে সশস্ত্র প্রতিরোধ একটি “অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ” হবে। তিনি চাভেজের সামনে তিনটি বিকল্প রাখেন- মিরাফ্লোরেসে থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই, জনগণের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা, অথবা পদত্যাগ না করে দেশ ছেড়ে সাময়িকভাবে সরে যাওয়া। কিউবার নেতার পরামর্শ ছিল তৃতীয় পথটি বেছে নেওয়ার, যাতে ভবিষ্যতে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিউবা কূটনৈতিক স্তরে সক্রিয় হয়। ফিদেল মধ্যরাতে হাভানায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠানোর উদ্যোগ নেন এবং ভেনেজুয়েলায় চাভেজকে জীবিত উদ্ধারের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যদিও অভ্যুত্থানকারী সামরিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং চাভেজকে কোর্ট মার্শালের হুমকি দেয়।

এদিকে চাভেজকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তর করা হয়- ফুয়ের্তে তিউনা, তুরিয়ামো- এবং তিনি কার্যত বন্দি হয়ে পড়েন। সরকারি  টিভি চ্যানেল ভিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়, বেসরকারি মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে খবর “চাভেজ পদত্যাগ করেছেন”।

ফিদেল কাস্ত্রো এই তথ্যযুদ্ধের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। কিউবার বিপ্লবের ইতিহাস থেকেই তিনি জানতেন, একজন নেতার জীবিত থাকার খবর ছড়িয়ে দেওয়া কতটা রাজনৈতিকভাবে নির্ণায়ক। ১৯৫৭ সালে সিয়েরা মায়েস্ত্রায় তাঁর জীবিত থাকার প্রমাণ যেমন বাতিস্তার প্রচারযন্ত্র ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি ভেনেজুয়েলাতেও সঠিক খবর প্রকাশ ছিল জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে চাভেজের কন্যা মারিয়া গাব্রিয়েলা চাভেজ কোলোমেনারেস টেলিফোনে কিউবান টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, তাঁর বাবা কখনও পদত্যাগ করেননি, কোনও ডিক্রি স্বাক্ষর করেননি, তাঁকে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হয়েছে। এই বক্তব্য কেবল কিউবায় নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলির মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।

এই একটিমাত্র সাক্ষাৎকারই অভ্যুত্থানের মিডিয়া কৌশলে বড় আঘাত হানে। জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে পারে চাভেজ জীবিত, তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। কারমোনা সরকারের বৈধতার ভিত্তি ভেঙে পড়তে শুরু করে।

এরপর কিউবা হয়ে ওঠে সত্যের প্রধান বাহক। ফিদেল কাস্ত্রো নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন চাভেজের পরিবার, ভেনেজুয়েলার সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশ এবং বলিভারিয়ান আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে। নিজেকে তিনি বর্ণনা করেন এক ধরনের “সংবাদ সংগ্রাহক ও প্রেরক” হিসেবে একটি ফোন ও টেপ রেকর্ডারের মাধ্যমে।

শেষ পর্যন্ত জনগণ ও বলিভারিয়ান ন্যাশনাল আর্মড ফোর্সের পাল্টা অভ্যুত্থানে চাভেজ ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ফিদেল কাস্ত্রোর দৃঢ় বিশ্বাস সঠিক প্রমাণিত হয় যে  চাভেজ খুব দ্রুতই জনগণের কাঁধে ভর করে ফিরে আসবেন।

এই ঘটনাই কিউবা–ভেনেজুয়েলা সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। পরবর্তী দুই দশক ধরে দুই নেতা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মিত্র ও পরামর্শদাতা। চাভেজ কিউবাকে খুব কম দামে তেল সরবরাহ করে দ্বীপদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন, আর কিউবা ভেনেজুয়েলায় পাঠায় হাজার হাজার চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবক।

চাভেজ একবার বলেছিলেন, “ফিদেল আমার কাছে একজন পিতা, সহযোদ্ধা এবং নিখুঁত কৌশলের শিক্ষক।” এই সম্পর্ক লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বিকল্প রাজনৈতিক মেরু তৈরি করেছিল—যা আজও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

২০০২ সালের সেই অভ্যুত্থান তাই শুধু একটি ব্যর্থ সামরিক ষড়যন্ত্র নয়; এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সংহতি এবং তথ্যযুদ্ধে সঠিক কৌশল কীভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

ক্যারাকাসে নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসী পদক্ষেপ শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—এটি গত দু’শো বছরের মার্কিন ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’-এর ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিকতম অধ্যায়। ‘গণতন্ত্র রক্ষা’, ‘স্বৈরতন্ত্র দমন’, ‘ড্রাগ পাচার রোধ’ এই কথাগুলোর আড়ালে আসলে কাজ করে অপরিশোধিত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভেনেজুয়েলা তার ব্যতিক্রম নয়; বরং অন্যতম কেন্দ্রীয় লক্ষ্য।

১৭৭৫ সাল থেকে মার্কিন রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসই বলে দেয় ভূখণ্ড দখল, শাসক বদল, অন্তর্ঘাত, সামরিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক অবরোধ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মনরো ডকট্রিনের ছত্রছায়ায় মেসোআমেরিকা ও লাতিন আমেরিকাকে ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে, ঠান্ডা যুদ্ধকালে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে ইউরোপে ন্যাটো সম্প্রসারণ এই সবকিছুই একই ধারার অংশ। ইরান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া থেকে শুরু করে চিলি, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া, কিউবা, হাইতি- তালিকা দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত।

আজ সেই পুরনো নীতি নতুন বাস্তবতায় কাজ করছে। একমেরু বিশ্ব ভেঙে পড়েছে। ব্রিকস জোটে নতুন দেশ যোগ হচ্ছে, ডলার নির্ভরতা প্রশ্নের মুখে, গ্লোবাল সাউথ আর আগের মতো মাথা নত করতে রাজি নয়। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলার মতো দেশ যার হাতে বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলভান্ডার মার্কিন পুঁজির কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। কারণ, মাদুরো সরকার এক্সন মোবিল, শেভরন বা কোনোকোফিলিপসের মতো মার্কিন তেল হাঙ্গরদের শর্তহীন আধিপত্য মেনে নেয়নি।

এই কারণেই গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলার উপর চাপানো হয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। খাদ্য, ওষুধ, আর্থিক লেনদেন-সবকিছুই নিষেধাজ্ঞার ওপর আটকে। তাতেও যখন শাভেজ–মাদুরোকে ভাঙা যায়নি, তখন নতুন গল্প তৈরি হয়েছে-‘ড্রাগ ডিলার মাদুরো’, ‘স্বৈরাচারী সরকার’, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’। কর্পোরেট মিডিয়া সেই গল্প বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির একাংশ নীরব থেকেছে।

কিন্তু ভেনেজুয়েলার ইতিহাস জানলে বোঝা যায়, এই নাটক নতুন নয়। ২০০২ সালের এপ্রিল- এই একই ছক, এই একই মিথ্যা, এই একই মিডিয়া যুদ্ধ। ফিদেল কাস্ত্রো বুঝেছিলেন, এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্য। ঠিক যেমন ১৯৫৭ সালে সিয়েরা মায়েস্ত্রায় তাঁর জীবিত থাকার খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস ছাপিয়ে বাতিস্তার প্রচার ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি এবারও সত্য প্রকাশই ছিল প্রধান অস্ত্র।

২০০২ সালের ১২ এপ্রিল সকালে চাভেজ ফোনে কথা বলেন তাঁর মেয়ে মারিয়া গাব্রিয়েলার সঙ্গে। জানান তিনি পদত্যাগ করেননি, তিনি একজন “বন্দি রাষ্ট্রপতি”। মারিয়াকে বলেন ফিদেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সকাল ১০টা ০২ মিনিটে মারিয়া ফিদেলকে ফোন করেন। ফিদেল তাঁকে জিজ্ঞেস করেন “তুমি কি গোটা দুনিয়াকে এই কথা জানাতে চাও?” মারিয়ার উত্তর ছিল—“বাবার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।”

এক সেকেন্ড দেরি না করে ফিদেল কিউবান টিভির ‘গোল টেবিল’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক রান্ডি অ্যালোনসোকে ফোন করেন। মোবাইল ফোন ও টেপ রেকর্ডারে মারিয়ার কণ্ঠ রেকর্ড হয়। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে কিউবার জাতীয় টেলিভিশনে তা সম্প্রচারিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলিকে পাঠানো হয়। সিএনএন সেই বক্তব্য ভেনেজুয়েলাতেও সম্প্রচার করে।

এই একটি সাক্ষাৎকারেই অভ্যুত্থানের কর্পোরেট মিডিয়ার  ভিত্তি ভেঙে পড়ে। বিশ্ব জানতে পারে- চাভেজ জীবিত, তিনি পদত্যাগ করেননি।
এরপর টানা দু’দিন ফিদেল কার্যত সাংবাদিকের ভূমিকা নেন ফোনে খবর সংগ্রহ, রেকর্ড, সম্প্রচার। তিনি কথা বলেন ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর ইনস্পেক্টর জেনারেল লুকাস রিনকনের সঙ্গে, প্যারাট্রুপার ব্রিগেডের প্রধান জেনারেল রাউল ইসাইয়াস বাদুয়েলের সঙ্গে, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব জুলিও গার্সিয়ার সঙ্গে। তাঁদের মনে করিয়ে দেন সংবিধান, সিমন বলিভার, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কথা।

এদিকে কারাকাসের রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। “চাভেজকে ফিরিয়ে দাও” এই দাবিতে শহর উত্তাল। প্রেসিডেন্ট গার্ড আবার মিরাফ্লোরেসের দখল নেয়। বিদ্রোহী সেনারা বিভক্ত হতে শুরু করে।

চাভেজকে একপর্যায়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নেওয়া হয়। কিন্তু সেনারা গুলি চালাতে অস্বীকার করে। তাঁরা জানায়, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করলে তারা বিদ্রোহ করবে। অবশেষে ১৪ এপ্রিল ভোরে শাভেজকে উদ্ধার করে মিরাফ্লোরেসে ফিরিয়ে আনা হয়- জনগণ ও বিশ্বস্ত সেনাদের কাঁধে ভর করে।

ফিদেল পরে লিখেছিলেন, “আমার কোনো সন্দেহ ছিল না যে শাভেজ ফিরে আসবেন। আমার একটাই কাজ ছিল কীভাবে ওকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়। চিলির ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি আর হয়নি।”

আজ মাদুরো?

আজ শাভেজ ও ফিদেল কেউই নেই। কিন্তু আছেন শাভিস্তারা, ফিদেলিস্তারা। আছে সেই অভিজ্ঞতা যা বলে দেয় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে সত্য, জনসমর্থন ও সংবিধানই শেষ কথা। মাদুরোকে ‘ড্রাগ ডিলার’ আখ্যা দেওয়া, তাঁকে অপহরণ বা উৎখাতের চেষ্টা এই সবই সেই পুরনো ছকের নতুন সংস্করণ।

প্রশ্ন এখন একটাই- এই আগ্রাসনের সামনে কি লাতিন আমেরিকা, গ্লোবাল সাউথ, ব্রিকস জোট চুপ করে থাকবে? ২০০২ দেখিয়েছিল সবাই চুপ থাকলে ইতিহাস বদলায় না, আর কেউ রুখে দাঁড়ালে সাম্রাজ্যবাদও ভয় পায়।