প্রণব কান্তি বসু, রাজেশ ভট্টাচার্য

পাকিস্তানে ইরান-আমেরিকা বৈঠক শুরু হয়েছে। এই বৈঠকের ফলালফলের দিকে পৃথিবী তাকিয়ে। কিন্তু ইরানে যে যুদ্ধ চলছে, তার প্রভাব যে কতদূর আর কতদিন ধরে পড়বে, তার আন্দাজ খানিকটা পাওয়া যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি, আইএমএফের প্রধান বলেছেন যে, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব চিরস্থায়ী হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে বলেছে যে, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন দেখা যাচ্ছে। শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও ধাক্কা খেয়েছে। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৯ সালে গোটা দুনিয়াকে অস্থির করে দেওয়া তেলের বাজারে যে দু’টি বৃহৎ বিঘ্ন ঘটেছিল, তার থেকেও বেশি এই ইরান যুদ্ধের প্রভাব। যুদ্ধবিরতি যদি স্থায়ী হয়, ইরান-আমেরিকার বৈঠক যদি ফলপ্রসূ হয়, তাহলেও বিশ্বের তেল ও গ্যাসের বাজার থিতু হতে এবং তেলের দাম কমতে বেশ কয়েক মাস লাগবে।
 
কিন্তু, এই যুদ্ধের প্রভাব তো শুধু তেলের বা প্রাকৃতিক গ্যাসের উপরেই পড়ছে না।  সার (ইউরিয়া এবং অ্যামোনিয়া), সালফার, মিথানল, গ্রাফাইট, অ্যালুমিনিয়াম এবং আরও অনেক কাঁচামাল বা উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটেছে। অর্থাৎ, তেলের বা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সরাসরি ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। রান্নার গ্যাসের দাম বাড়বে, অটো-বাসের ভাড়া বাড়বে, গাড়ির খরচ বাড়বে। আবার, ছোট বা মাঝারি কারখানা, এমনকি বড় কারখানাও, যদি কাঁচামাল বা উপকরণের চড়া দামের ধাক্কা সামলাতে না পারে, তাহলে উৎপাদন কমতে বা বন্ধ হতে বাধ্য। তার ফলে, অন্যান্য পণ্যেরও দাম বাড়বে। মানুষ কাজ হারাবে, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে। অর্থনীতির তত্ত্বে একে বলে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’, মানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং তার ফলে বেকারত্বের হার বাড়ে, তার সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতিও ঘটে। যা খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে কিন্তু এই স্ট্যাগফ্লেশনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
 
ভারতে পেট্রল ও ডিজেলের উপর কেন্দ্র বিশেষ অতিরিক্ত অন্তঃশুল্ক কমানোর ফলে এখনও অবধি পেট্রল এবং ডিজেলের দাম বাড়েনি। তবে, এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনগুলি মিটে গেলে দাম বাড়বে সেটা নিশ্চিত।  সরকারি কোষাগারের উপর চাপ পড়ছে। অনুমান, প্রায় দেড়-দু’লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে কেন্দ্র। ফলে, সরকারি ব্যয় কমবে, পরিকাঠামো-সহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পে যদি ব্যয় বরাদ্দ কমে, তার সরাসরি প্রভাব অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে পড়বে, আর সামাজিক এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পে যদি ব্যয় বরাদ্দ কমে, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি গরিব মানুষের খাদ্য-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংস্থানে পড়বে।

নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। তাই, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রাজ্যের মানুষ এখন আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্রীয় ঘটনাগুলি নিয়ে চিন্তিত: ভোটাধিকার হারানো, আবেদন, প্রতিবাদ, নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, আদৌ হবে কি না, না হলে নির্বাচন কি বৈধ হবে, এসব কি বাঁকা পথে রাষ্ট্রপতি শাসনের মাধ্যমে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতায় আনার অভিসন্ধি। এই সমস্ত প্রশ্ন। কিন্তু, ইরানের উপর ইজরায়েল-আমেরিকার আক্রমণের অর্থনৈতিক প্রভাবে ভারতে যে অসংখ্য মানুষ জীবিকা হারাতে শুরু করেছেন, তাদের এ সব ভাবার ফুরসত নেই। গোড়াতেই খোলসা করে নেওয়া উচিত যে এই অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ভারত সরকারকে দায়ী করা যায় না, কারণ আজকের বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে ভারতের কোনও মান্যতা নেই। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আমাদের এমনই দুরাবস্থা যে, না কোনও বড় আন্তর্জাতিক ঘটনার পূর্বাভাস আমাদের কোনও দেশ দেয়, না আর আমরা কোনও ইঙ্গিতের বিশ্লেষণ করতে পারি। আমরা সাধারণত আমেরিকার লেজুড়বৃত্তি করি, কিন্তু আমাদের দশা টিকটিকির ল্যাজের মত, যা টিকটিকি অনায়াসে ছেঁটে ফেলে। তাই তো বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এই যুদ্ধের দু’দিন আগেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল গিয়ে তাদের সংসদে বক্তৃতা করে এসেছেন।

খুব সংক্ষেপে দেখা যাক, সাধারণ অর্থনীতি কেমন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে, এই মার্চে, উপকরণ মূল্য বৃদ্ধি এবং চাহিদা (বিশেষ করে বিদেশী) হ্রাসের এবং সাধারণ অনিশ্চয়তারকারণে গত ৪৫ মাসের মধ্যে শিল্পক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির দরুন আগামী আর্থিক বছরে মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার অন্তত ১% হ্রাস পাবে অ্যার মূল্যবৃদ্ধির হার ১.৫% বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার এক মাসে ৭২৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর কারণ এক দিকে যেমন রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে (হরমুজ প্রণালী থেকে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ থাকার দরুন), অন্যদিকে তেমন জ্বালানি খরচ বাড়ছে, অন্যান্য আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে। উপরন্তু, বিদেশে চাকরিরত ভারতীয়দের ঘরে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার স্রোতও কমেছে। এর কারণ এই প্রবাহের ৩৮% আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে। বৈদেশিক বাণিজ্য এবং মুদ্রাভাণ্ডারের পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে টাকার মূল্যে যা এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা হিসাবে ডলার প্রতি ৯৫.২১ টাকায় বিনিময় হচ্ছে। শুধু শিল্প নয়, কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে, মূলত সে সমস্ত কৃষি উৎপাদনে যার বাজার বিদেশে, যেমন বিশেষ কিছু চাল, মশলা ইত্যাদি।

সমস্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে যেমন হয়, এবারও স্বাভাবিক কারণেই, নিম্নবিত্তের মানুষ বেশি ভুক্তভোগী। এই যুদ্ধ আমাদের দেশকে এবং বিশেষ করে ছোট এবং মাঝারি শিল্পের উৎপাদনকে এবং এই শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের বিরাট অংশকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। শ্রম আইন পরিবর্তন ও সাধারণ চাকরির বাজারের স্থায়ী মন্দার কারণে, আজকাল বেশিরভাগ নিয়োগই চুক্তিভিত্তিক বা অনিয়মিত (ক্যাজুয়াল)। এর ফলে উৎপাদন কমলেই তার কোপ খুব সহজেই পড়ে শ্রমিকদের উপর। এছাড়া, এই যুদ্ধজনিত আকস্মিক মন্দার প্রকোপ মূলত পড়েছে ছোট এবং মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) উপর। এমএসএমই ক্ষেত্রে মোট নিযুক্ত শ্রমিকের আনুমানিক ৬০% কাজ করে; মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৩০% এই ক্ষেত্রে উৎপন্ন হয় এবং রপ্তানির প্রায় ৪০% এই ক্ষেত্রই যোগান দেয়। প্রথমত, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং তার সঙ্গে পণ্য বিক্রি করে আয়ের অনিশ্চয়তা। বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার চাহিদার তুলনায় ৬০-৭০% যোগান ছিল মার্চ মাসে। এর ফলে, রাস্তার ধারে ছোট খাবারের দোকান থেকে বড় রেস্তরাঁ, ক্যাটারারদের ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। খুব ছোটগুলি আপাতত বন্ধ। সুরাতের বস্ত্রশিল্পে শ’য়ে শ’য়ে কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।  কর্মরত হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক শহর ছেড়ে নিজের রাজ্যে ফিরছেন।  কোভিডের সময়ের পরিযায়ী শ্রমিকদের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য চোখে ভাসছে— প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই সঙ্কটকালে কোভিডের স্মৃতি উস্কে দিয়েছেন।
 
এ ছাড়াও ছোট এবং মাঝারি সংস্থা, যারা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ধাতুর পাত কাটার জন্য গ্যাস আবশ্যিক। আবার এদের ক্রেতারা অনেকেই তাদের উৎপন্ন বিক্রি করে বিদেশে। ফলে তাদের চাহিদাও কমে গিয়েছে। শুধু জ্বালানির সঙ্কট নয়; অন্যান্য অশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত উপকরণের জন্যও এই ক্ষেত্র আমদানি নির্ভর, যেমন প্লাস্টিক, নানা রাসায়নিক ও রঞ্জক পদার্থ। শুধু পেট্রোপণ্যের আমদানিই ব্যহত হয়েছে এমন নয়। অন্যান্য ধাতুর আমদানিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, তামার চাহিদার মাত্র ৩% থেকে ৫% অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পূরণ করে।
 
একটা সময় ছিল, নেহেরুর আমলে, যখন ভারত বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এখন আমরা নিজেদের হিতাহিত ভুলে, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের মত দেশের অকারণ আজ্ঞাবাহীতে পরিণত হয়েছি। অকারণ এ জন্যে যে আমাদের হিতসাধন এর সঙ্গে যুক্ত নয়। ইরানের বর্তমান শাসককূল অবশ্যই অমানবিক, অগণতান্ত্রিক, ঘৃণ্য। কিন্তু, ইজরায়েলও তো গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত— আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু অবলীলায় ইজরায়েলকে সমর্থন করেছে, এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজোড়া আন্দলন এবং ধিক্কারকে উপেক্ষা করে। মনে হয় হিন্দুত্ববাদ এবং শত্রুর শত্রু আমার মিত্র, এই সরল নিষ্ফল তত্ত্ব থেকে ইরানের উপর হামলার সমর্থন। আমাদের উচিত ছিল নিজের দেশের লাভ-ক্ষতি বিচার করে, এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে বোঝানো। বর্তমানে, BRICS-এর সভাপতি হওয়ায়, ভারতের কাছে সুযোগ ছিল এই ভূমিকা রাখার। 

(প্রণব কান্তি বসু বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং রাজেশ ভট্টাচার্য আইআইএম ক্যালকাটার অধ্যাপক)