ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে বাড়ির ছাদ, থরথর করে কাঁপছে ঘরের চেয়ার-টেবিল, চারদিকে চরম আতঙ্ক আর চিৎকার। প্রাণ বাঁচাতে যেখানে মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে, সেখানে এক মুহূর্তও নিজের জীবনের কথা না ভেবে এক ছুটে ছোট্ট নাতিকে বুক দিয়ে আগলে নিলেন এক বৃদ্ধা। গত সোমবার (৮ জুন, ২০২৬) দক্ষিণ ফিলিপিন্সে আঘাত হানা শক্তিশালী ৭.৮ তীব্রতার বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সময়কার একটি সিসিটিভি ফুটেজ নেটপাড়ায় ভাইরাল হতেই বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএ (CNA ) এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই বৃদ্ধাকে এখন ‘সুপারহিরো ঠাকুমাবলে সম্মান জানাচ্ছেন নেটিজেনরা।


ভাইরাল হওয়া ওই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি বাড়ির বসার ঘরে সোফায় বসেছিল একটি ছোট শিশু। হঠাৎ করেই ৭.৮ তীব্রতার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে পুরো ঘরটি মারাত্মকভাবে দুলতে শুরু করে। তীব্র ঝাঁকুনিতে ঘরের আসবাবপত্র কেঁপে ওঠে।

বিপদ বুঝে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করেননি ঘরে উপস্থিত ওই বৃদ্ধা। তিনি বিদ্যুৎগতিতে নাতির দিকে ছুটে যান এবং তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মাটির তীব্র কম্পন ও ঝাঁকুনির চোটে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি দেওয়ালের পাশে মেঝেতে বসে পড়েন এবং নিজের পুরো শরীর দিয়ে নাতিকে ঢেকে ফেলেন, যাতে ওপর থেকে কোনও ছাদ ভাঙা অংশ বা চাঙড় শিশুর গায়ে না পড়ে। নিজের পিঠকে ঢাল বানিয়ে নাতিকে আগলে রাখার এই দৃশ্যই ছুঁয়ে গেছে নেটিজেনদের মন।

?ref_src=twsrc%5Etfw">June 8, 2026

 

 

ভিডিওটি এক্স এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়তেই ঝড়ের গতিতে ভিউজ ও কমেন্ট আসতে শুরু করে। বিপদের মুখে বৃদ্ধার এমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করছেন সবাই। একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এই ‘সুপারহিরো ঠাকুমা’ এক সেকেন্ডের জন্যও দ্বিধা করেননি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে নাতিকে বাঁচালেন। পরিবার ও ভালবাসা কাকে বলে, ইনিই তার প্রমাণ।”

দ্বিতীয় একজন মন্তব্য করেছেন, “অন-গ্রাউন্ড সিসিটিভি ফুটেজ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ৭.৮ তীব্রতার ভূমিকম্প কতটা ভয়ানক হতে পারে। এত চাপের মধ্যেও ওঁর এই অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্স এবং উপস্থিত বুদ্ধির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রইল।”

তবে কয়েকজন ইউজার যখন সমালোচনা করে বলেন যে তিনি আরও ভাল উপায়ে ঘরের বাইরে যেতে পারতেন, তখন অন্য একজন তাঁদের কড়া জবাব দিয়ে লেখেন, “আপনার মনে হতে পারে উনি ভুল করেছেন বা বোকার মতো কাজ করেছেন, কিন্তু যতক্ষণ না আপনার সঙ্গে এমনটা ঘটছে, ততক্ষণ এই চরম আতঙ্কের পরিস্থিতি বোঝা অসম্ভব।”

 

সোমবার সকালে ফিলিপিন্সের সারণগনি প্রদেশের উপকূল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৩ কিমি গভীরে এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এর প্রভাবে ফিলিপিন্সের মিন্দানাও এবং ৪২০ কিমি দূরে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের মানাদো শহরেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তরের (AHA Centre) সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী:

 

 

ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান (ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া)       পরিসংখ্যান

মোট নিশ্চিত মৃত্যু                                                কমপক্ষে ৩৭ জন

আহত মানুষের সংখ্যা                                           ৪৮৮ জনেরও বেশি

নিখোঁজ ব্যক্তি                                                       ৪ জন

ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি                                                  ২,৫০০-র বেশি বাড়ি

সুনামি তরঙ্গের উচ্চতা                                          কিয়াম্বায় সর্বোচ্চ ১.৪৮ মিটার

 

এই ভূমিকম্পের পর ফিলিপিন্স সহ জাপান, ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াতেও সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। অবশ্য গত সোমবার বিকেলের পর সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। ভূমিকম্পের জেরে ফিলিপিন্সের প্রায় ৬,২০০টি স্কুলে ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।


বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ফিলিপিন্স ভৌগোলিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের অত্যন্ত সক্রিয় এবং টেকটোনিক্যালি জটিল “রিং অফ ফায়ার”  বেল্টের ওপর অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রায়শই এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা দেখা যায়। তবে এই ধ্বংসলীলা ও আতঙ্কের মাঝেও  ফিলিপিন্সের এই ঠাকুমার মতো মানবিক রূপকথার গল্পগুলোই মানুষকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগাচ্ছে সেখানকার অধিবাসীদের।