'আমার জীবনের আশীর্বাদ', 'বাবা' আলাউদ্দিন খাঁর কঠোর সাধনায় রবিশঙ্করের সমর্পণ, সেতারে বাঁধা প্রজন্মকালের সৃষ্টি
- 1
- 19
কিছু সম্পর্কের বন্ধন অবিচ্ছেদ্য। দেশ কালের সীমানা পার করে একে অন্যকে খুঁজে নেয়৷ সৃষ্টির ধারাপাতে নতুন তাল মিলের ভাগ যোগ, ছন্দে ছন্দে সেই সুরে জীবনের তারও বাঁধা হয়ে যায় অজান্তেই। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-সাহেব আর পণ্ডিত রবিশঙ্করের গুরু শিষ্য পরম্পরার সেই শৈল্পিক সমর্পণ জীবনের ছন্দকে সুরে তালে বেঁধে রেখেছে প্রজন্মকাল৷
- 2
- 19
শিল্পের জগতে রবিশঙ্করের পদার্পণ নৃত্যশিল্পী হিসাবে। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর বড়দাদা উদয় শঙ্করের সঙ্গে প্যারিসে যান।
- 3
- 19
১৩ বছর বয়সে তিনি উদয়শঙ্করের নৃত্যদলের পূর্ণ সদস্য হন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৮ বছর, তিনি উদয়শঙ্করের অধীনেই নাচ শিখেছেন এবং উদয়শঙ্করের আন্তর্জাতিক নৃত্যদলের সদস্য হিসেবে রবিশঙ্কর প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন, রোম-সহ ইউরোপের বহু শহরে অনুষ্ঠান করেন।
- 4
- 19
সেই সময় তিনি শুধু নৃত্যশিল্পীই ছিলেন না; বিভিন্ন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রও বাজাতেন এবং নৃত্যনাট্যে অংশ নিতেন। ১৯৩৪ সালে কলকাতার একটি সঙ্গীত সম্মেলনে প্রথম উস্তাদ আলাউদ্দিন খান-এর বাজনা শোনেন।
- 5
- 19
আলাউদ্দিন খাঁর সুর শুনে তাঁর মনে হয়েছিল, এমন সঙ্গীত তিনি আগে কখনও শোনেননি। সেই মুহূর্তেই তিনি স্থির করেন যে, যদি সত্যিই সঙ্গীত শিখতে হয়, তবে এই মানুষটির কাছেই শিখতে হবে।
- 6
- 19
পরে ১৯৩৫ সালে ইউরোপ সফরের সময়ও আলাউদ্দিন খানের সংস্পর্শে আসেন। রবিশঙ্কর বলেছিলেন, "আমি যখন প্রথম বাবা আলাউদ্দিন খানকে দেখি, তখন বুঝতেই পারিনি এত সাধারণ চেহারার মানুষটির ভিতরে কী অসাধারণ শক্তি লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাঁর বাজনা শোনার পর মনে হয়েছিল, এ যেন মানুষের নয়, ঈশ্বরের আশীর্বাদ।" — এই অনুভূতির কথাই রবিশঙ্কর লিখেছিলেন তাঁর আত্মজীবনীতে।
- 7
- 19
অবশেষে ১৯৩৮ সালে নাচ ছেড়ে মাইহারে গিয়ে তাঁর কাছেই সেতারের তালিম শুরু করেন। রবিশঙ্কর যখন প্রথম মাইহারে পৌঁছন, তখন তিনি কেবল একজন প্রতিভাবান তরুণ। ইউরোপে দাদা উদয়শঙ্করের নৃত্যদলে ঘুরে বেড়ানো, মঞ্চের আলো, করতালির উচ্ছ্বাস—সবই তাঁর পরিচিত।
- 8
- 19
কিন্তু আলাউদ্দিন খানের কাছে এসে যেন একেবারে নতুন জীবন শুরু হল। এখানে তারকা হওয়ার কোনও গুরুত্ব ছিল না; গুরুত্ব ছিল শুধু সাধনার। উস্তাদ আলাউদ্দিন খান ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলার প্রতীক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রেওয়াজ, সুরের প্রতি নিষ্ঠা এবং প্রতিটি স্বরকে নিখুঁত করে তোলার অবিরাম চেষ্টা—এটাই ছিল তাঁর শিক্ষা।
- 9
- 19
ভুল হলে বকুনি ছিল, কখনও কঠিন শাসনও। কিন্তু সেই কঠোরতার আড়ালে ছিল একজন গুরুর অকৃত্রিম স্নেহ। তিনি জানতেন, সত্যিকারের শিল্পী তৈরি করতে হলে শুধু হাত নয়, মনকেও গড়ে তুলতে হয়।
- 10
- 19
রবিশঙ্করও সেই পরীক্ষায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর কাছে সেতার আর শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র রইল না; হয়ে উঠল জীবনের ভাষা। তিনি পরে বহুবার বলেছেন, আলাউদ্দিন খানের কাছে তিনি শুধু সঙ্গীত শেখেননি, শিখেছিলেন জীবনকে সম্মান করতে, শিল্পকে পূজা করতে।
- 11
- 19
রবিশঙ্করের মনে তখন একটাই স্বপ্ন—সুরের গভীরে পৌঁছনো। উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি আর কোনও খ্যাতিমান শিল্পী নন, তিনি শুধু এক শিক্ষার্থী।
- 12
- 19
ভোরের আলো ফোটার আগেই রেওয়াজ শুরু হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই সুর, একই আলাপ, একই অনুশীলন। সামান্য ভুল হলেই কড়া ধমক, কখনও রাগও। রবিশঙ্কর পরে বহুবার বলেছেন, "সেই সময়টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কিন্তু আজ বুঝি, ওই কঠোরতা না থাকলে আমি কোনও দিন শিল্পী হতে পারতাম না।"
- 13
- 19
রেওয়াজ, শাসন, অনুশাসন—এই নিয়েই কেটে গেল টানা সাত বছর। সেই সাধনার প্রথম বড় স্বীকৃতি এল ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে। গুরুপুত্র আলি আকবর খানের সঙ্গে যুগলবন্দিতে প্রথম বড় মঞ্চে সেতার হাতে দেখা গেল রবিশঙ্করকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পেল নতুন এক নক্ষত্রের আলো৷
- 14
- 19
১৯৫৬ সালে ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রথম একক সফরে রবিশঙ্করের সেতার যেন ভারতীয় সঙ্গীতের দূত হয়ে উঠল। সেই সফরের পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি বলতেন, “আমার সমস্ত অর্জনের ভিত গড়ে দিয়েছেন বাবা আলাউদ্দিন খান।” এই 'বাবা' সম্বোধনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক শিষ্যের আজীবন কৃতজ্ঞতা।
- 15
- 19
জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে কাজ, উডস্টক, মন্টেরে পপ ফেস্টিভ্যাল—সব মিলিয়ে সেতারের সুর পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রতিটি কোণে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পরেও রবিশঙ্কর নিজের পরিচয় দিতেন তিনি 'বাবা'র শিষ্য।
- 16
- 19
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমার জীবনে যদি সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ কেউ হয়ে থাকেন, তিনি আমার গুরু আলাউদ্দিন খান। তিনি আমাকে শুধু সেতার শেখাননি, শিখিয়েছেন শৃঙ্খলা, বিনয় আর শিল্পের প্রতি নিঃশর্ত ভালবাসা।"
- 17
- 19
একবার রবিশঙ্কর বলেছিলেন, "বিশ্বের যেখানেই যাই, যত সম্মানই পাই না কেন, মনে হয় আমি এখনও সেই মাইহারের ছাত্র, যে বাবার সামনে বসে সেতার শেখার চেষ্টা করছে।"
- 18
- 19
প্রকৃত গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে শিক্ষা শুধু সুরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে জীবনবোধে, চরিত্রে, মূল্যবোধে। একজন গুরু তাঁর শিষ্যকে শুধু শিল্পী বানান না, মানুষও বানান।
- 19
- 19















