নতুন ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য দরকার ছিল একটি হাই-এন্ড দামি ল্যাপটপ। কিন্তু সেই ল্যাপটপ কেনার জন্য জমানো প্রায় ২ লক্ষ টাকার বাজেট এক তুড়িতে বাতিল করে দিলেন মণিপুরের এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কারণ, ল্যাপটপের চেয়েও ওঁর কাছে অনেক বেশি দামি ছিল শৈশব থেকে বুকে লালন করা একটি স্বপ্ন— সশরীরে গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ -এর ম্যাচ দেখা! ২০২৬ সালের মেগা ফুটবল বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে বসে উপভোগ করতে মণিপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ৪০ বছর বয়সী ওই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এখন আমেরিকার বিমান ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মণিপুরের বাসিন্দা ওর্থিহান জিংখাই  শুনিয়েছেন ওঁর ফুটবল প্রেম, আর্থিক টানাপোড়েন এবং সমস্ত বাধা পেরিয়ে আমেরিকার গ্যালারিতে পৌঁছানোর এক রূপকথার গল্প। ৪০ বছর বয়সী জিংখাই জানান, উত্তর-পূর্ব ভারতের যে পাহাড়ি অঞ্চলে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে ফুটবল স্রেফ একটা খেলা নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি আরও জানিয়েছেন, ওঁর গ্রামে ভাল ফুটবল বা বুট কেনার মতো সামর্থ্য কারও ছিল না। ছোটবেলায় তাঁরা প্লাস্টিক এবং পুরোনো ছেঁড়া কাপড় গোল করে মুড়িয়ে বল বানিয়ে খেলতেন।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের সময় ওঁর গ্রামে একটাও রঙিন টিভি ছিল না। জিংখাই বলেন, “গ্রামে কেবল একটা সাদা-কালো টিভি ছিল। খেলা দেখার জন্য গ্রামবাসীরা সবাই মিলে টাকা তুলে জেনারেটরের তেলের খরচ জুগিয়েছিল। সেই থেকে আমি টিভির পর্দায় প্রতিটি বিশ্বকাপ দেখেছি। প্রথমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালের ফ্যান হই, পরে প্রিমিয়ার লিগ দেখা শুরু করি। কিন্তু কোনওদিন সামনাসামনি গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পাব, সেটা অসম্ভব মনে হতো।”

 

অবশেষে দীর্ঘ তিন দশক পর ওর্থিহানের সেই ‘অসম্ভব’ স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। তবে ওঁর গ্রাম থেকে আমেরিকার আটলান্টা পৌঁছানোর সফরটা কোনও রোমাঞ্চকর সিনেমার চেয়ে কম নয়। জিংখাইয়ের গ্রামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত, যার আশেপাশে কোনও বিমানবন্দর নেই।

আমেরিকা পৌঁছাতে প্রথমে তাঁকে ৬ ঘণ্টা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে আসতে হবে। সেখান থেকে দিল্লির বিমান ধরতে হবে। দিল্লি থেকে লন্ডন, লন্ডন থেকে ওয়াশিংটন ডিসি এবং সেখান থেকে কানেক্টিং ফ্লাইটে পৌঁছাতে হবে আটলান্টা। ওঁর এই ট্রিপে মোট ৪টি ফ্লাইট বদলাতে হবে এবং প্রায় ২৭ ঘণ্টা মাঝ-আকাশে কাটাতে হবে!

পেশায় ফুল-টাইম কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ওর্থিহান ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের জন্য ভিডিও তৈরি করেন। ভালো ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য চলতি বছরেই তিনি ২,২০০ থেকে ২,৫০০ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২.১ থেকে ২.৪ লক্ষ টাকা) মূল্যের একটি ল্যাপটপ কেনার জন্য টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ দেখার খরচ আর ল্যাপটপ— দুটো একসঙ্গে চালানো ওঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তিনি দ্বিধাহীনভাবে ল্যাপটপ কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট বুক করেন।

জিংখাই জানান, ওঁর এই স্বপ্নপূরণের পেছনে ওঁর পরিবারের অবদান অনবদ্য। ওঁর শ্বশুরমশাই দিল্লি থেকে ওয়াশিংটন ডিসি-র বিমানের টিকিটের টাকা দিয়েছেন এবং আমেরিকায় থাকা ওঁর আত্মীয়রা থাকার খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন। ওঁর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দৈনিক আয় যেখানে ৫০০ টাকার কাছাকাছি, সেখানে এত বড় ট্রিপের খরচ জোগাতে ওঁর পরিবার বিগত কয়েক মাস ধরে অন্য সমস্ত কেনাকাটা ও অন্যান্য ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করে টাকা জমিয়েছেন।


ওর্থিহানের এই স্বপ্নের যাত্রায় টিকিটের লড়াইটাও ছিল মারাত্মক। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফিফা-র অফিশিয়াল টিকিট বিক্রির সময় প্রতি টিকিটে ৩৫০ ডলারের বাজেট নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ইচ্ছে ছিল পর্তুগাল, ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখার। কিন্তু সার্ভারে যখন ওঁর নম্বর আসে, তখন দেখেন পর্তুগালের টিকিটের দাম ৪৫০ থেকে ৬৫০ ডলারে ঠেকেছে, যা ওঁর বাজেটের বাইরে। চিন্তাভাবনা করতে করতেই সব টিকিট সোল্ড-আউট হয়ে যায়। ওর্থিহান ভেবেছিলেন ওঁর স্বপ্ন বুঝি ওখানেই শেষ।

কিন্তু ভাগ্যবদল হয় গত এপ্রিল মাসে, যখন ফিফার পরবর্তী টিকিট সেল শুরু হয়। এবার আর বড় দলের পেছনে না ছুটে তিনি সস্তা টিকিটের দিকে নজর দেন। অবশেষে মাত্র ১৪০ ডলার করে ক্যাটাগরি-৩-এর দুটি টিকিট পেয়ে যান তিনি। একটি নিজের জন্য এবং অন্যটি ওঁর ফুটবলপ্রেমী শ্বশুরমশাইয়ের জন্য। আটলান্টায় হতে চলা ‘চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা’র ম্যাচের টিকিট পেয়েছেন তিনি।

তবে টিকিটের এই কালোবাজারি বা ‘রিসেল মার্কেট’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি খেয়াল করেছেন, যে টিকিট তিনি ১৪০ ডলারে কিনেছেন, তারই পাশের সিটের টিকিট অন্য ওয়েবসাইটে ৫৬০ ডলারে রিসেল বা পুনর্বিক্রি করা হচ্ছে। জিংখাই বলেন, “একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে এটা অত্যন্ত হতাশাজনক। কিছু মানুষ খেলা দেখার জন্য নয়, স্রেফ মুনাফা কামানোর জন্য টিকিট কিনে কালোবাজারি করে। এর ফলে আমাদের মতো সাধারণ ও খাঁটি ফুটবল ভক্তদের জন্য গ্যালারিতে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।”

কালোবাজারির ক্ষোভ থাকলেও, আপাতত সমস্ত বাধা পেরিয়ে মণিপুরের পাহাড় থেকে আমেরিকার গ্যালারিতে ওর্থিহানের এই ওড়ার গল্প লাখো ফুটবল ভক্তের মনে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।