মৃত্যু মানেই কান্না, শোক আর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া—এটাই পৃথিবীর চেনা নিয়ম। কিন্তু ভারত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা আফ্রিকার কাছাকছি রহস্যময় দ্বীপ মাদাগাস্কারের গল্পটা একেবারেই আলাদা। সেখানে মৃত্যু কোনও শোকের উৎসব নয়, বরং এক অদ্ভুত পুনর্মিলনের আনন্দ। সেখানে মৃত পূর্বপুরুষরা কবরের অন্ধকারে একা পড়ে থাকেন না, প্রতি ৫ থেকে ৭ বছর অন্তর তাঁরা ফিরে আসেন পরিবারের চেনা বৃত্তে, মেতে ওঠেন নাচ-গান আর দেদার হুল্লোড়ে! বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও বিস্ময়কর এই লোকচারটির নাম ‘ফামাদিহানা’।
মাদাগাস্কারের আদিবাসী মালাগাসি সংস্কৃতির এই উৎসব সাধারণত আয়োজিত হয় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের শুষ্ক মরশুমে। নির্দিষ্ট দিনে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, সানাই বাজিয়ে গোটা পরিবার জড়ো হয় পারিবারিক গোরস্থানে। এরপর অত্যন্ত যত্নের সাথে খুঁড়ে ফেলা হয় পূর্বপুরুষের কবর। ভেতর থেকে বের করে আনা হয় তাঁদের কঙ্কাল বা অস্থির অবশিষ্টাংশ! বছরের পর বছর মাটির নীচে থাকায় পুরোনো পোশাক নষ্ট হয়ে যায়, তাই পরম মমতায় সেই হাড়গুলোকে মুড়ে দেওয়া হয় একদম নতুন, চকচকে রেশমি কাপড়ে।
নতুন পোশাকে ‘সাজিয়ে’ নেওয়ার পর শুরু হয় আসল উৎসব। পূর্বপুরুষের সেই অস্থি অবশেষ কাঁধে তুলে নিয়ে শঙ্খধ্বনি আর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নাচতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা! শ্মশান বা কবরস্থানের বিষাদ ভুলে চারপাশ মেতে ওঠে এক অপার্থিব উৎসবে।
কবর থেকে সোজা সেই অস্থি নিয়ে আসা হয় নিজেদের ভিটেবাড়িতে। সেখানে বসে এলাহি খাওয়া-দাওয়া, মদ্যপান আর গল্পগুজবের আসর। ঘরের নতুন সদস্যদের, বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের এই ‘হাঁটাচলাহীন’ আত্মীয়ের সঙ্গে! এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রায়ই স্বপ্নে এসে দেখা দেন। আমরা যখন তাঁদের কবর থেকে বের করে নতুন পোশাকে একসঙ্গে সময় কাটাই, তাঁরা ভীষণ খুশি হন।”
মালাগাসি সংস্কৃতির মানুষের বিশ্বাস, শরীর ছেড়ে চলে গেলেও আত্মা চিরকাল পরিবারের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে। মৃত্যুর পর মানুষ কোথাও হারিয়ে যায় না, বরং সে পরিবারের রক্ষাকর্তা-এ পরিণত হয়। তাঁদের বিশ্বাস, যদি নিয়মিত এই ‘ফামাদিহানা’ উৎসবের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের তুষ্ট না করা হয়, তবে তাঁদের অভিশাপে পরিবারে নেমে আসতে পারে চরম বিপর্যয়।
কালের নিয়মে এই প্রাচীন ধারা আজ কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে। আধুনিক শহুরে ব্যস্ততা, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি আর মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই বিপুল খরচ সাপেক্ষ উৎসব আয়োজন করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি, রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিদরাও মাঝেমধ্যেই এই কবর খোঁড়ার প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে এত বাধা সত্ত্বেও, মাদাগাস্কারের গ্রামীণ এলাকায় আজও সমান উদ্দীপনায় টিকে রয়েছে এই ‘হাড় কাঁপানো’ ভালবাসার উৎসব। উৎসব শেষে আবার অশ্রুসজল চোখে, পরম শ্রদ্ধায় সেই অস্থিগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মাটির গভীর শয্যায়—পরবর্তী কয়েক বছরের অপেক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
















