আজকাল ওয়েবডেস্ক: বরফাচ্ছন্ন জনমানবহীন প্রান্তরে পথ হারিয়ে, জাহাজডুবির পর আটকা পড়ে অথবা পাহাড়ে আরোহণের শক্তি হারিয়ে আটকা পড়ে মানুষ যখন শারীরিক সহ্য সীমার শেষ পর্য়ায়ে পৌঁছে যায়, তখন অসাধারণ কিছু ঘটতে পারে। সেই মুহূর্তে বেঁচে থাকা অসম্ভব বলে মনে হয়। তখন কখনও কখনও একজন নীরব সঙ্গী আবির্ভূত হয়। এটি কোনও বিভ্রম নয়, বরং একটি শান্ত, অবিচল উপস্থিতি যাকে রক্ষাকারী বলে মনে হয়। এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটি ‘থার্ড ম্যান সিনড্রোম’ নামে পরিচিত। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি অভিযাত্রী, মনোবিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করে আসছে।
১৯১৪-১৭ সালের অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের বর্ণনায় অভিযাত্রী আর্নেস্ট শ্যাকলটন ঘটনাটির উল্লেখ করেন। শ্যাকলটন এবং তাঁর সঙ্গীরা ঠান্ডায় জমে যাওয়া অবস্থায়, দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপের দুর্গম যাত্রার সময় বারবার অনুভব করেছিলেন যে তাদের দলের পাশে চতুর্থ একজন ব্যক্তি হেঁটে চলেছেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল, দলের একাধিক সদস্য এই চতুর্থ ব্যক্তির উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন। কিন্তু তা আলোচনা করতে দ্বিধা করেছিলেন সকলেই। আদতে কেউ না থাকলেও সকলেই পড়ে বলেছিলেন যে, কেউ একজন তাঁদের সঙ্গে ছিল।
তারপর থেকে এভারেস্ট আরোহী, একা নাবিক, মেরু অভিযাত্রী এমনকি মারাত্মক দুর্ঘটনার পরে জীবিতরাও একই ধরনের ঘটনার সাক্ষী হওয়ার কথা জানিয়েছেন। যাঁরাই এই ‘তৃতীয় ব্যক্তি’র উপস্থিতি অনুভব করেছেন, তাঁরা প্রায়শই এই অদৃশ্য উপস্থিতিটিকে একটি অবলম্বন হিসেবে বর্ণনা করেন। অনেকের কাছে এই অদৃশ্য ‘সঙ্গী’ ঠিক সেই মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছেন, যখন সব আশা ফুরিয়ে যেতে শুরু করে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ঘটনাটি অত্যাধিক চাপের সময় মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন শরীর একটি বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছয় (যেমন তীব্র ঠান্ডা, অনাহার, অক্সিজেনের অভাব, অবসাদ) তখন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ করার প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়ায়, মস্তিষ্ক এমন একটি মানসিক সত্ত্বা তৈরি করতে পারে, যাকে গবেষকরা ‘বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা’ বলে অভিহিত করেন। এটি মনোযোগ ধরে রাখা, ভয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্যক্তিকে সচল রাখার জন্য তৈরি একটি মানসিক কাঠামো। অন্য কথায়, মানসিক পতন রোধ করার জন্য মন একটি সহায়ক উপস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে ঘুমের অভাব, একাকীত্ব বা নির্দিষ্ট কিছু স্নায়বিক অবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনুভূতি দেখা যায়। ‘থার্ড ম্যান সিনড্রোম’-এর কার্যকারিতা হল, এই উপস্থিতি ভয় দেখানোর পরিবর্তে পথ দেখায়, বিভ্রান্তি তৈরি না করে সাহায্য করে। এটি প্রায় একটি জরুরি মনস্তাত্ত্বিক উপকরণের মতো কাজ করে, যা মন কেবল চরম প্রয়োজনে ব্যবহার করে।
একটি বিষয় স্পষ্ট, ‘থার্ড ম্যান সিনড্রোম’ জীবন বাঁচিয়েছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা প্রায়শই এই অদৃশ্য উপস্থিতিকে কৃতিত্ব দেন। এটি তাঁদের শান্ত থাকতে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে, হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করেছে। এটি হয়তো একটি বিভ্রম, কিন্তু এটি অত্যন্ত সহায়ক একটি বিভ্রম।
