বদলাচ্ছে আবহাওয়া। গুটি গুটি পায়ে বিদায় নিচ্ছে শীত। সন্ধে নামার পর হালকা ঠান্ডাভাব থাকলেও দুপুরে শীত পোশাক গায়ে রাখা দায়! মরশুম বদলের সন্ধিক্ষেই বাড়ে বিভিন্ন রোগের উপদ্রব। তাই বসন্তের গন্ধে মেজাজ যতই ফুরফুরে থাকুক, এই সময়ে সামান্য অসাবধানতায় মাথাচাড়া দিতে পারে সর্দি-কাশি থেকে পেটের গোলমাল কিংবা জটিল রোগ। তাই শরীরের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। এবিষয়ে পরামর্শ দিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অনির্বাণ দোলুই।
কেন বাড়ে রোগভোগের দাপট
শীত পেরিয়ে গরমের শুরুটা শরীরের কাছে সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর মধ্যে একটি। শীতকালে আমাদের শরীর একরকম ছকে চলে। কিন্তু শীতের শেষ আর গরমের শুরুর মাঝামাঝি আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরকে নানাভাবে মানিয়ে নিতে হয়। তখনই শীতের অভ্যাস ভাঙতে সময় নেয় শরীর। হঠাৎ তাপমাত্রা কমলে বা বাড়লে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। শীতের বিদায় নেওয়ার বেলায় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কম-বেশি হতে থাকে।তাপমাত্রা ঠান্ডা থেকে ধীরে ধীরে হয় উর্ধ্বমুখী। যা খুব সহজেই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধির আদর্শ সময় হয়ে ওঠে। শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেন শুকিয়ে দেয়। ফলে জীবাণু খুব সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সাধারণ সমস্যা
মরশুম বদলের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হল ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি। আসলে শীতের মতো এই সময়েও বাতাসে ধুলোবালির দাপট থাকে বেশি। দিনে গরম, রাতে হালকা ঠান্ডা-দু’রকম আবহাওয়ায় বাড়ে অ্যালার্জির সমস্যা। তাপমাত্রা হেরফেরের জন্য নাক-মুখ থেকে ফুসফুস পর্যন্ত ইমিউনিটিতে প্রভাব পড়ে। মরশুম বদলের সময়ে শ্বাসযন্ত্রের উপরের অংশে প্রভাব পড়ে। গলাব্যথা, হাঁচি, কাশি, সর্দি, জ্বর হতে দেখা যায়। প্রধানত যে সব ভাইরাস এই সময়ে থাকে তা হল রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস, করোনা ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে স্ট্যাফাইলোকক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস ইত্যাদি।
পেটের গোলমাল
শীতের শেষে ও বসন্তের আগমনের আগে পেটের সমস্যাও হতে পারে। কড়াইশুঁড়ির কচুরি থেকে পিঠে-পুলি, শীতের আমেজে বাঙালির হেঁশেলে আনাগোনা থাকে হরেক খাবারের। খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম চলে মরশুম বদলের সময়েও। সঙ্গে কম খাওয়া হয় জল। শীতকাল চলছে, এই ধারণা থেকে অনেকেই রান্না করা খাবার দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখেন। এদিকে তাপমাত্রার হেরফেরে খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে পেটের ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
চিকেন পক্সের দাপট
বসন্তের ঠিক আগে থেকে যে রোগের ভাইরাস আশপাশের বাতাসে ঘুরে বেড়ায় আর সুযোগ পেলেই গ্রাস করে, তার নাম বসন্ত বা চিকেন পক্স। শুরুতে জ্বর, গা ম্যাজম্যাজ, শরীর কমজোরি থেকে পেটের গন্ডগোল দেখা দেয়। এরপর পক্সের গুটি বেরনো আরম্ভ হলে আর রক্ষা নেই। বয়স্কদের পক্সের ভাইরাস থেকে হারপিস জস্টার নামে এক ধরনের রোগ হতে পারে৷ যা থেকে নিউরোপ্যাথি ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক্ষেত্রে প্রবীণদের বিশেষভাবে সাবধান হতে হবে। ভ্যাকসিন নিলে সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।
শ্বাসজনিত সমস্যা
যারা নিয়মিত শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগেন, অ্যাজমা, সিওপিডি রয়েছে, তাদের এই সময়ে বাড়তি সাবধানতা প্রয়োজন। বাতাসে ঘুরে বেড়ানো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া সহজেই নাক-মুখ দিয়ে শ্বাসযন্ত্রে চলে যায়। ফলে নতুন করে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশু-বয়স্কদের বাড়তি নজর
শিশু আর বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। শীতের পর গরমের এই বদলটা তাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন ইনফেকশন হলে বার বার সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন সময় মতো নিতে হবে। বড়দেরও ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।
মেনে চলুন
* হঠাৎ করে গরম লাগলে ঠান্ডা জল খাওয়া চলবে না।
* গরম থেকে এসিতে বার বার যাতায়াত করা, সামান্য গরমে ফ্যান চালানো উচিত নয়।
* হাঁচি, কাশির সমস্যা থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করুন।
* বিশেষ করে বয়স্করা কিংবা যারা কোমর্বিডিটিতে ভুগছেন তাদের সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
* বাইরে থেকে এসে এবং খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধোওয়া অভ্যাস করুন৷
* স্কুলে বাচ্চাদের একজনের থেকে অন্যজনের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই সন্তানের জ্বর,সর্দি,কাশি থাকলে স্কুলে না পাঠানোই ভাল।
* শিশু থেকে বয়স্ক, সব বয়সেই পর্যাপ্ত জল খাওয়া প্রয়োজন।
* সবজি, ফল কিংবা অন্যান্য খাবার টাটকা খেতে হবে। রান্না করা বাসি খাবার না খাওয়াই শ্রেয়।
* কোনও কোমর্বিডিটি থাকলে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার নিয়ম মেনে চলুন।
* নির্দিষ্ট সময়ে ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।
