প্রায় দশ-বারো ঘণ্টা কেটে গিয়েছে অফিসে, পাহাড়প্রমাণ কাজের চাপে। বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই ছোট্ট মেয়ের আবদার আইসক্রিম খেতে যাবে। প্রথমে বোঝালেন। তারপর জেদ আর বায়নায় মেজাজ হারালেন। মেয়ের পিঠে পড়ল দু’ঘা। যার জেরে বেধে গেল গৃহযুদ্ধ!
কিংবা অফিসে বস কাজের পর কাজ চাপিয়ে চলেছেন। আপনার সাধ্যের বাইরে চলে গেলেও না বলার জো নেই! চারপাশে চাকরির যা হাল! ফল ভুগছে আপনার শরীর আর কর্মক্ষমতা। সর্বক্ষণ পরিশ্রান্ত, কাজে একের পর এক ভুল। কি? চেনা লাগছে তো? স্বাভাবিক। এ ছবিই তো এখন ঘরে ঘরে। কারণ হল পেশাগত পরিসর আর ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা। যাকে বলে, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স। আর এই ব্যালেন্স জলাঞ্জলি গেলেই যত সমস্যা। কারণ ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স যত কমবে, ততই খেসারত দেবে আপনার জীবন। শরীর থেকে মন, প্রভাব পড়বে সবেতেই। 

কী ধরনের প্রভাব? 

লাগাতার পুওর ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স নানা ভাবে আপনাকে ধস্ত করে ছাড়ে। পেশাগত চাপ যদি সাধ্যের অতিরিক্ত হয়ে দাঁড়ায়, আপনি ক্লান্ত হওয়ার পাশাপাশি তার রেশ গিয়ে পারিবারিক জীবনে পড়বেই। আবার নিত্য পারিবারিক অশান্তির জেরে বিক্ষিপ্ত মনে কাজ একদিকে যেমন আপনার মেজাজের পারদ চড়িয়ে দেবে, তেমনই কমিয়ে দেবে কর্মক্ষমতা। আসুন চিনে নেওয়া যাক, শরীর-মনের উপরে এই পুওর ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সের চিহ্নগুলো। শরীর – নিয়মিত ক্লান্তি, মাথাব্যাথা, ঘুম না হওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ঘুম থেকে উঠেও পরিশ্রান্ত বোধ করা। মন – সারাক্ষণ মানসিক চাপ, কথায় কথায় কাজ নিয়ে উদ্বেগ, খিটখিটে হয়ে থাকা, কাজে বিরতি নিলে অপরাধবোধে ভোগা। আচরণ – সর্বক্ষণ অফিসের ইমেল বা মেসেজ চেক করা, আপনার অনুপস্থিতিতে কী ঘটে গেল তা নিয়ে ভয়ে থাকা, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ নেওয়া। ব্যক্তিগত জীবন – জীবনে কোনও রকম শখ না থাকা, পরিবার বা কাছের মানুষদের সময় না দেওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে যথাসম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রাখা। 

এসব আপনারও হচ্ছে কী? তা হলে সময় এসেছে ব্যবস্থা নেওয়ার। এ সব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে মনোবিদের পরামর্শ। তাঁরাই আপনার জীবনটাকে ফের গুছিয়ে ভারসাম্য এনে দিতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোজকার রুটিনে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস একটু একটু করে আপনার ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সকে সঠিক জায়গায় এনে দিতে পারে।

কী করবেন?


•    প্রতিদিনের কাজগুলোকে একটু ভাগ করে নিন। গুরুত্বপূর্ণ এবং কাজগুলোকে আগে সেরে নিন। তুলনায় অদরকারি কাজগুলো রাখুন পরে করার জন্য কিংবা প্রয়োজনে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিন। যে কাজগুলো আজকের বদলে কাল করলেও চলবে, সেগুলো কালকের জন্যই তুলে রাখুন। একেবারেই গুরুত্বহীন কাজগুলো, যেগুলো না করলেও কোনও ক্ষতি নেই, সেগুলো বাদ দিয়ে দিন। এই কাজের ব্যাপারটা কিন্তু আপনার পেশাগত এবং ব্যক্তিগত, দুই পরিসরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
•    একই ধরনের কাজগুলো এক-একটা ভাগে করুন। এতে সময়টাকে গুছিয়ে নেওয়া সহজ হবে। ধরা যাক, আপনার চার জনকে ইমেল করতে হবে, তিন জনকে ফোন এবং দুটো রিপোর্ট লিখতে হবে। ইমেলগুলো এক দফায় সেরে নিন। সেভাবেই ফোন বা রিপোর্ট লেখাটাও এক এক দফায় টানা করুন। 
•    একটানা কাজ করে যাবেন না। আধঘণ্টা টানা কাজ করলে অবশ্যই একটা ছোট্ট বিরতি নিন। তারপর আবার কাজে বসুন। এতে কর্মক্ষমতা বাড়বে।
•    প্ল্যানার বা ডিজিটাল ক্যালেন্ডার মেনে কাজের রুটিন তৈরি করুন এবং তা মেনে চলার চেষ্টা করুন। 
•    পেশাগত কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় ভাগাভাগি করে নিন। চেষ্টা করুন তা মেনে চলতে। ধরা যাক, পেশাগত কাজের জন্য সময় রেখেছেন সন্ধে ৭টা পর্যন্ত। সে ক্ষেত্রে তার পরে আপৎকালীন পরিস্থিতি ছাড়া আর অফিসের ফোন বা মেল দেখবেন না। তবে যাঁরা এমার্জেন্সি সার্ভিসে রয়েছেন, অর্থাৎ ডাক্তার, পুলিশ, দমকল বা সংবাদমাধ্যমের মতো পেশায় এটা সম্ভব নয়। তাঁদের ক্ষেত্রে ছুটির দিন যথাসম্ভব পেশাগত কাজ থেকে দূরে থাকা জরুরি।
•    যতক্ষণ জেগে থাকবেন, মোবাইলে কাজের নোটিফিকেশন দেখা বন্ধ করুন। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে ব্যক্তিগত পরিসরকে এবং নিজেকে গুরুত্ব দিন।    
•    না বলতে শিখুন। সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপানো বা দাবি মেনে নেবেন না। অসুবিধে হলে মুখ ফুটে বলুন। রাগারাগি না করে ভাল ভাবে, মিষ্টি কথাতেও নিজের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দেওয়া যায়। বুঝিয়ে বললে অশান্তির আশঙ্কাও কমে। সে কর্মক্ষেত্রে হোক বা বাড়িতে।  
•    কাছের মানুষ, সে বাড়ির লোক হোক বা বন্ধুবান্ধব, তাদের সঙ্গে সময় কাটান। পেশাগত আলোচনা দূরে রেখে নির্ভেজাল আড্ডা-আনন্দে কাটান। এ সময়টাই কিন্তু আপনার অক্সিজেন হয়ে উঠবে।
•    দিনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময় তুলে রাখুন একান্তভাবে নিজের জন্য। সে সময়টায় পছন্দের যে কোনও কাজ— বই পড়া, ছবি আঁকা, গান শোনা, যা হোক করুন। এতে মনের শান্তি ফিরবে। 
•    ডিপ ব্রিদিং, হাল্কা শরীরচর্চা রাখুন রোজকার রুটিনে। এছাড়া মনোবিদদের সাহায্য নিলে তাঁরা মানসিক চাপ কমানোর আরও নানা ধরনের টেকনিক শিখিয়ে দেবেন।
তবে হ্যাঁ, মাথায় রাখবেন এই প্রত্যেকটা জিনিসই কিন্তু দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিমত করে ফেলতে হবে। তবেই ভাল হবে আপনার ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স।

রোজকার পৃথিবী যত ছুটছে, ততই পেশাগত কাজ ও ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে পাঁচিলটা মুছে ফেলতে চাইছে মানুষ। আর সেখানেই যত গোলমাল। একটু নিয়ম মেনে সবটা ভাগাভাগি করে দেখুন না। পার্থক্যটা নিজেই বুঝতে পারবেন। আর তাতে ভাল থাকবেন আপনিই।