আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অবহেলিত হয় খাওয়াদাওয়া। সকালের জলখাবার সেরে ফেলা হয় শুধু এক কাপ কফিতে। দুপুরের খাবার সময় পিছিয়ে যায়। আর রাতের খাওয়ার সময়েরও ঠিক থাকে না। মনে হতে পারে এতে ক্যালোরি কমছে। কিন্তু বাস্তবে এই অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস নিঃশব্দে শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য নষ্ট করে। শক্তি কমে যায়, অকারণ খিদে বেড়ে যায়, রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করে। ফলে ওজন কমানো ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা, দুটোই বাধাগ্রস্ত হয়।

সার্জন ডা. অরুশ সাবরওয়াল বলেন, “অনেকেই ভাবেন, মিল বাদ দিলে ক্যালোরি কমে যাবে। কিন্তু এতে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।” তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয় এবং জমা গ্লুকোজ রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে পরে হঠাৎ করে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

একই মত পোষণ করেছেন ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ও প্রোক্টোলজিস্ট ডা. মুস্তাকিম খান। তাঁর কথায়, “আমরা কী খাই তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কখন খাই। বিশেষ করে যাঁদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মিল বাদ দিলে রক্তে শর্করার অনিয়মিত ওঠানামা দেখা যায়।”

শরীর নিয়ম মেনে চলতে পছন্দ করে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার না পেলে শরীর ‘সারভাইভাল মোড’-এ চলে যায়। ডা. সাবরওয়াল জানান, দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর শরীর স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে এবং সঞ্চিত গ্লুকোজ রক্তে ছেড়ে দেয়। এতে স্থিতিশীল শক্তি পাওয়ার বদলে হঠাৎ এনার্জি বাড়ে, আবার দ্রুত কমেও যায়। এর ফলেই অবসাদ, খিটখিটে মেজাজ এবং খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। যাকে অনেকেই ক্লান্তি ভেবে ভুল করেন।

দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে শরীর শক্তি সঞ্চয়ে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে। এতে বিপাকক্রিয়া, ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যস্ততার অজুহাতে সকালের জলখাবার বাদ দেওয়া একটি বড় ভুল। “রাতভর না খেয়ে থাকার পর শরীরের জ্বালানি প্রয়োজন,” বলেন ডা. সাবরওয়াল। সকালের খাবার না খেলে অনেকেই দুপুরে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন বা চিনি-সমৃদ্ধ খাবার ও ক্যাফেইনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে সাময়িক শক্তি মিললেও পরে ক্লান্তি এসে যায়। ফলে প্রতিদিনই তৈরি হয় এক অদৃশ্য ‘রোলারকোস্টার’।

চিকিৎসক খানের পর্যবেক্ষণও একই রকম। তাঁর মতে, “দিনভর খুব কম খেলে অনেকে রাতে বেশি খান। এতে সকালে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় এবং সারাদিন মনমরা লাগে।”

খাবার দেরিতে খেলে খিদে বাড়তে থাকে। ফলে রাতে বেশি খাওয়া হয়ে যায়। যে সময় শরীর বড় মাত্রার খাবার হজমে প্রস্তুত থাকে না। ডা. খানের সতর্কবার্তা, রাতের অতিরিক্ত খাওয়া ঘুমের সময় রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ আরও খারাপ করতে পারে।

জলপানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই খাবারের বদলে কফি বা চা দিয়ে খিদে চেপে রাখেন, যা সাময়িকভাবে কাজ করলেও রক্তে শর্করার ওঠানামা এবং হজমের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ক্যালোরি কমানোর চেয়ে নিয়মিত ও সুষম খাবার অনেক বেশি কার্যকর। ডিম ও টোস্ট, দইয়ের সঙ্গে বাদাম, ডাল-রুটি বা সবজি স্যান্ডউইচের মতো হালকা ও সুষম মিল রক্তে শর্করার হঠাৎ পরিবর্তন আটকাতে সাহায্য করে। পরিমিত ও সময়মতো খাবার শক্তি স্থিতিশীল রাখে, ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করে এবং অপ্রয়োজনীয় খিদে কমায়।