বাংলা কবিতার আকাশে তিনি নির্জন, মায়াময় নক্ষত্র। তাঁর কাব্যভুবনে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা আর মরমি অনুভবের অনন্য মিশেল। জীবনানন্দ দাশ। রূপসী বাংলার এই কবির আজ ১২৭তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষ্যে এক নান্দনিক আয়োজন করে সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়।
জীবনানন্দের কবিতায় গ্রাম বাংলার ধানক্ষেত, কাশফুল,নদী, পাখি-সবই আছে। তবে তা কেবল দৃশ্য নয়, আছে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা, সময়চেতনা, একাকিত্বের সুর। বাংলার এই নিসর্গ, নির্জনতার মহান কবির জন্মদিবস সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহে বিশেষভাবে পালনের উদ্যোগ নেয় আনন্দী কমিউনিকেশন সেন্টার। প্রতি বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি জীবনানন্দ দিবস উদযাপন করার অঙ্গীকার নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার জীবনানন্দকে নিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক তথা সাংবাদিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের রচিত ‘ক্লান্ত প্রাণ এক’ নাটকের শ্রুতিপাঠ অনুষ্ঠিত হয়। কবির জীবনকে ছুঁয়ে দেখার এহেন প্রয়াস এই প্রথম। শুধু শ্রুতিপাঠ নয়, সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৃশ্যায়নের এক অনন্য অভিজ্ঞার সাক্ষী হলেন দর্শকেরা।
এদিন শ্রুতিনাটকে জীবনানন্দের ভূমিকায় কন্ঠ দেন টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের কর্ণধার তথা সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য সত্যম রায়চৌধুরী। তাঁকে সঙ্গ দেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরা। এসএনইউ-র প্রেক্ষাগৃহে এই অনবদ্য শ্রুতিপাঠে অংশগ্রহণ করেছিলেন ডাঃ অমিতাভ চন্দ, ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য, রাজীব ভট্টাচার্য, স্নেহাশিস সুর, আশিস চক্রবর্তী , তাপস দত্ত,প্যান্সি সাহা, গার্গী দত্ত, মান্ডবী চক্রবর্তী। আবহ সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিলেন শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়।
জীবনানন্দের সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কবিতা। কীভাবে শ্রুতিনাটকের মাধ্যমে কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্যের ভাবনা বাস্তবায়িত হল? সত্যম রায়চৌধুরীর কথায়, “জীবনানন্দ মানেই বাংলার কবি, প্রকৃতির মুগ্ধতা। নাটকের নাম ‘ক্লান্ত এক প্রাণ’-এর মতো পড়তে চেষ্টা করেছি। খুব ভাল লেগেছে। অংশগ্রহণকারীরা সকলেই প্রতিষ্ঠিত গুণী মানুষ।” একইসঙ্গে তিনি জানান, প্রতি বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি জীবনানন্দ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নাটকের ভাবনা ও নির্মাণ প্রসঙ্গে শঙ্করলাল ভট্টাচার্য বলেন, “আমি বরাবরই জীবনানন্দ পড়তে ভালবাসি। কবির সবকিছুই পড়ার চেষ্টা করেছি। আজ থেকে বারো-চোদ্দ বছর আগে আমার কাছে বাংলাদেশের বিখ্যাত সংস্থা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন সিনেমা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বাংলাদেশ মানেই আমার জন্য জীবনানন্দ দাশ। যা শুনে খুশি হয় ওই সংস্থা। আমি কবিকে নিয়ে ফিল্ম স্ক্রিপ্ট তৈরি করি। কিন্তু ছবি তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত-দু’দেশের সমান অংশ নিতে হত। কিন্তু এখানে অনেক প্রযোজকই আগ্রহ দেখায়নি। এরপর সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। ফলে পরবর্তীকালে নাটকরূপে প্রকাশ করি।”
এই আয়োজন শুধু জীবনানন্দের জন্মদিন উদযাপন নয়, কবিকে যেন নতুন করে আবিষ্কারের এক আন্তরিক প্রয়াস। শ্রুতিনাটক, আবহসঙ্গীত ও দৃশ্যায়নের মেলবন্ধনে জীবনানন্দের কবিতার নিঃসঙ্গ পথ, বাংলার মায়াময় প্রকৃতি আর বেদনার সুর এদিন ছুঁয়ে গিয়েছে উপস্থিত সকলকে।
