বাংলায় শীতের ছোঁয়া বড়জোর দু’মাস। সারা বছর গরমের চোটে হাঁপিয়ে উঠে এই কয়েক দিন একটু শান্তি। তাই তো উত্তুরে হাওয়া জাঁকিয়ে বসলেই জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, ঘুরতে যাওয়ার জন্য উড়ু উড়ু করে মন। এবছর যদিও শীতের দাপট একটু বেশি। তবে তাতে কি! গায়ে সোয়েটার-জ্যাকেট চাপিয়েই আজ পার্টি, তো কাল পিকনিক, পরশু বন্ধুদের আড্ডার মজলিশে দিব্যি মেতে উঠেছে বাঙালি। এদিকে লাগামছাড়া ভূরিভোজ আর লেপ-কম্বল ছেড়ে শারীরিক কসরত করার আলসেমিতে উঁকি দিচ্ছে মেদ। ঘন ঘন হানা দিচ্ছে রোগব্যধি। তাই শীতকালে চুটিয়ে আনন্দ করার মাঝেও ডায়েটের জলাঞ্জলি দিলে চলবে না। বরং ঠান্ডার মরশুমে দরকার ডায়েটে বাড়তি নজর।
শীত এলেই খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসে বদল আসে। ঠান্ডায় যেমন খিদে বাড়ে, তেমনই শরীর চায় গরম ও ভারী খাবার। তাহলে সকাল থেকে রাত, কখন কী খাবেন? পরামর্শ দিলেন পুষ্টিবিদ রিঙ্কি বিশ্বাস।
ঘুম থেকে উঠেঃ ২৫০ মিলি জলে কুচোনো আদা, অল্প দারচিনি, কাঁচা হলুদ, গোলমরিচ,তুলসীপাতা, লবঙ্গ দিয়ে ভাল করে ফুটিয়ে ছেঁকে নিয়ে খান। ডায়াবেটিস না থাকলে এক চামচ খাঁটি মধু দিতে পারেন। ঠান্ডায় নিয়মিত এই পানীয় খেলে সর্দি-কাশিতে আরাম পাবেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
ব্রেকফাস্টের আগেঃ হার্বাল টি খাওয়ার পর এক চামচ মিক্সড সিড, ড্রাই ফ্রুট মিশিয়ে খেতে পারেন। এই সময় ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস সমৃদ্ধ বিভিন্ন ধরনের বীজ খেলে বয়স নির্বিশেষে উপকার পাওয়া যায়।
ব্রেকফাস্টঃ শীতকালে গরম ব্রেকফাস্ট সবচেয়ে ভাল। যেমন শীতের সব সবজি দেওয়া চিড়ের পোলাও, উপমা ইত্যাদি। এই সময় বিভিন্ন ধরনের মরশুমি সবজি যেমন সরষের পরোটা, মেথি শাকের পরোটা, রাঙা আলুর পরোটা, বিটের পরোটা খেতে পারেন। ব্রেকফাস্ট প্রোটিন সমৃদ্ধ হলে সারা দিন ক্রেভিং কম হবে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওটসের ওমলেট কিংবা রোজ একটা করে ডিম সেদ্ধ খাওয়া যেতে পারে। নিরামিষাশীরা কাবলি চানা সেদ্ধ করে শশা, পেয়াঁজ, টমেটো দিয়ে চাট বানিয়ে খেতে পারেন কিংবা মাশরুম স্যঁতে করে খাওয়াও ভাল।
মিড মর্নিং- কমলালেবু, পেয়ারা, আপেল কিংবা যে কোনও মরশুমি ফল খান মিড মার্নিং-এ। তবে অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে শরীর বুঝে ফল খাওয়া জরুরি। এছাড়া এবিসি অর্থাৎ আপেল, বিট, গাজর এবং সঙ্গে আমলকি দিয়ে জুস বানিয়ে খেতে পারেন। নিয়মিত এই জুস খেলে ত্বক, চুল ভাল থাকে, বাড়ে ইমিউনিটিও।
লাঞ্চ: শীতকালে অনেকে ভাত খেতে পছন্দ করেন না। সবরকমের সবজি দিয়ে পোলাও স্টাইলে রাইস খেতে পারেন। এই সময় বাধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলির মতো মরশুমি সবজি খাওয়া ভাল। তার সঙ্গে রাখুন চিকেন, ডিম। শীতে পাঁচ মিশালি সবজি দিয়ে ডাল খেতে যেমন সুম্বাদু, তেমন স্বাস্থ্যকরও। শীতের স্যালাডে কাঁচা মুলো রাখুন। শীতের এই সবজিতে রয়েছে ভরপুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, উচ্চ মাত্রায় ফাইবার থাকায় পেট অনেকক্ষণ ভর্তি রাখে। এছাড়া পটাশিয়াম বেশি থাকে বলে হাই প্রশারে উপকারী।
বিকেলের স্ন্যাকসঃ বাড়িতে বানানো তিল কিংবা ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে গুড়ের চিক্কি বা লাড্ডু খেতে পারেন। এই সময় ডায়েটে গুড় রাখলে শরীর উষ্ণ থাকে, আয়রনের ঘাটতি মেটে। ভাল ফ্যাটের চাহিদা পূরণে নিয়মিত ডায়েটে রাখুন এক চামচ ঘি। বিকেলের দিকে ঘি-এর মধ্যে সুইট কর্ন কিংবা সব রকম সবজি স্যঁতে করে গোলমরিচ ছড়িয়ে খেতে পারেন। বয়স ৫০-এর বেশি হলে কিংবা আথ্রাইটিসের সমস্যা থাকলে বিকেলে ২০০ মিলি দুধে জাফরান দিয়ে খেতে পারেন। এতে ক্যালশিয়ামের খাটতি মিটবে। এছাড়া ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ রাগী, বাজরা গুড় দিয়ে রোল করে খেতে পারেন।
ডিনারঃ আমিষাশীরা রুটি দিয়ে চিকেন স্টু খেতে পারেন। নিরামিষ খেতে চাইলে বিভিন্ন সবজি দিয়ে সুজির উত্তাপাম, সুজির ইডলি, বাজরার রুটি, মিলেট পোলাও শীতের ভাল ডিনার। রাতের ডায়েটে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট রাখাই ভাল।
শুতে যাওয়ার আগেঃ ডিনার করার খানিকক্ষণ বাদে দারচিনি ফুটিয়ে জল খেয়ে নিন। এতে শীতের রাতে শরীর গরম থাকবে৷ কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে দারচিনি এড়িয়ে যাওয়া শ্রেয়।
মেনে চলুন
• শীতে পরিমাণ মতো জল খাওয়া খুব জরুরি। নচেৎ ত্বকে রুক্ষতা, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়ে।
• ধূমপানের নেশা থাকলে শীতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
• নাক ডাকার অভ্যাস থাকলে কিংবা হাই প্রেশারের রোগীরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হাঁটাহাঁটি করুন।
• শীতে মদ্যপান করলে সতর্ক থাকুন। অ্যালকোহল খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লে শরীরে ঠিক মতো অক্সিজেন পৌঁছয় না। এতে নাক ডাকার সমস্যা বাড়ে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও থাকে। তাই ঠান্ডায় অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। আর মদ্যপান করলে রাতে চার-পাঁচ ঘন্টার ব্যবধানে শুতে যান।
