পরমা দাশগুপ্ত
বৈশাখ পড়তে না পড়তেই রোদে-ঘামে নাজেহাল হওয়ার জোগাড়! এত গরম ভাল্লাগে না বাপু বলে আপনি না হয় সেঁধিয়ে গেলেন এসি-র অন্দরে। বয়স কম হলে যেমন তেমন করে গরম এড়ালেই হল। কিন্তু যাঁদের বয়স ষাট পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সত্তরের দিকে, কিংবা আরও বেশি? তাঁদের জন্য কিন্তু সবকিছু এতটাও সহজ নয়। বরং গরম বাড়লে আর ঠিকমতো সাবধান না হলেই পদে পদে রয়েছে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি।
এই সময়টায় তাই পরিবারের প্রবীণদের দিকে একটু বাড়তি নজর রাখতেই হবে। করতে হবে বাড়তি যত্ন। তবেই তাঁদের সুস্থ রাখা সহজ হবে। কী কী করা যায় তা হলে?
মাথায় রাখুন একটা চেকলিস্ট। আর সামান্যতম অসুবিধেতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তাহলেই কেল্লাফতে!
জল খাওয়ার লক্ষ্যমাত্রাঃ তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, তাতে ডিহাইড্রেশন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে অনেকটাই। বয়স্ক মানুষেরা প্রয়োজনের তুলনায় জল কম খেলে তাই অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। অন্তত ১০ গ্লাস জল খেতে হবে সারাদিনে। অনেক সময়ে তেষ্টা পেলে বা ভিতরে ভিতরে ডিহাইড্রেশন হয়ে গেলেও বোঝা যায় না। প্রবলে গরমে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি এবং ব্লাড প্রেশার নেমে যাওয়া ডিহাইড্রেশনের উপসর্গ। তাই অবশ্যই সাবধানে রাখুন প্রবীণদের। হাতের কাছেই রেখে দিন জলের বোতল। শরীরে আর্দ্রতা বজায় রাখতে তাঁদের ভালভাবে স্নান নিশ্চিত করুন। অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি না থাকলে প্রবল গরমে রাতে শোওয়ার আগেও অল্প স্নান করতে বলতে পারেন, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের মত নিয়ে।
খাওয়াদাওয়াঃ ডায়াটিশিয়ান পম্পা রায় বলছেন, “এ সময়টায় নিয়ম মেনে সহজপাচ্য, হাল্কা খাবার খাওয়া এবং শরীরে আর্দ্রতার ভাগ ঠিক রাখাটাই প্রবীণদের সুস্থতার চাবিকাঠি। তাই অতিরিক্ত গরমে বারে বারে জলপান, ঘরে তৈরি শরবত, লস্যি, ঘোল বা ডাবের জল খাওয়া শরীরে জলশূন্যতা এড়াতে সাহায্য করবে। রোজকার খাবারেও রাখতে হবে জলের ভাগ বেশি আছে এমন ফল বা সব্জি। একেবারে কম তেলমশলা দিয়ে রান্না, পাতলা মাছের ঝোল এ সময়টায় উপকারী। বাইরের খাবারদাবার, সরবত, কোল্ড ড্রিঙ্কস একেবারেই দেবেন না। চা-কফিও একেবারে কম খাওয়া জরুরি।”
পোশাকআশাকঃ গরমে আরামে রাখুন বাড়ির বয়স্কদের। খেয়াল রাখুন তাঁরা যেন একেবারে পাতলা জামাকাপড় পরেন। হাল্কা রঙের সুতি, লিনেন বা খাদির ঢিলেঢালা পোশাক বেছে দিন তাঁদের জন্য। তাতে শরীর ঠান্ডা থাকবে।
বাইরে বেরোলেঃ তুমুল গরমে, বিশেষত দিনের বেলা প্রবীণদের বাইরে যেতে দেবেন না খুব প্রয়োজন না হলে। বেরোতে হলে রোদ পড়ার পরে কিংবা সন্ধেই ভাল। একান্তই রোদের সময়ে জরুরি কাজে বেরোতে হলে একেবারে হাল্কা পোশাক পরতে বলুন। মাখতে বলুন অন্তত এসপিএফ৩০ মাত্রার সানস্ক্রিন। অবশ্যই সঙ্গে থাক ছাতা বা টুপি, সানগ্লাস, জলের বোতল এবং বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে হলে সহজপাচ্য খাবার, ওআরএস এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ। বয়স্কদের রোদে হাঁটাহাঁটি একেবারেই করতে দেবেন না। কম দূরত্বে হলেও বাড়ির গাড়ি, রিকশা বা অন্য কোনও যানবাহন ব্যবহার করা নিশ্চিত করুন।
শরীরচর্চায় সাবধানতাঃ বয়স যত বাড়ে, স্বেদগ্রন্থিও তার কর্মক্ষমতা হারাতে থাকে। ফলে ঘাম বেশি ঝরে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে। এ সময়ে প্রবীণদের তাই খুব বেশি পরিশ্রমের ব্যায়াম না করাই ভাল। বদলে যোগাসন বা অল্প হাঁটার মতো হাল্কা শরীরচর্চা করলেই সুস্থ এবং ঝরঝরে থাকা যাবে।
অ্যালার্জিতে নজরঃ গ্রীষ্মের মরশুমে নানা ধরনের পরাগরেণু বাতাসে ওড়ে। তা ছাড়া তাপমাত্রার হেরফের, কালবৈশাখী, নিম্নচাপও লেগেই থাকে। ফলে নানা ধরনের অ্যালার্জির প্রকোপ বাড়ে এই সময়টায় যাতে বয়স্কদের অসুস্থ হয়ে পড়ার প্রবণতাও থাকে বেশি। একটুতেই গলা খুশখুশ, চোখে অস্বস্তি বা জল পড়া, নিঃশ্বাসে সাঁই সাঁই শব্দ, বমি ভাব, ত্বকে র্যাশের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফলে যথাসম্ভব সাবধানে রাখতে হবে তাঁদের। বিশেষত যে সমস্ত প্রবীণেরা অ্যাজমার রোগী, এ সময়টায় তাঁদের হাঁপানির টান ওঠার মাত্রা ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ে। কারও এতটুকু সমস্যা দেখলে তাই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।
বেলাগাম মেজাজঃ গরমে, রোদে, ঘামে অস্বস্তিতে যে কোনও মানুষই মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। অনেকে এমনিতেই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে খিটখিটে হয়ে পড়েন। ফলে প্রবল গরমে প্রবীণদের মেজাজ খারাপ বা বিরক্তি বেড়ে যায় অনেকটাই। এই পরিস্থিতির কথা খেয়াল রেখে তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন ঠান্ডা মাথায়। রাগ বা বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে এমন প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলুন যথাসম্ভব। রাগারাগি করে শরীর খারাপ হলে বয়স্করাও যেমন ভুগবেন, বাড়ির অন্যরাও পড়বেন সমস্যায়।
গরম মাত্রা ছাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে এখনই। চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে পরিবারের প্রবীণদের তাই সাবধানে রাখুন। সঙ্গে ভাল থাকুন নিজেরাও।















