সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাচ্ছে জীবনধারা, বদলে যাচ্ছে মানুষের সম্পর্কের সমীকরণও। তবে আজকের প্রজন্মের তরুণ-তরুণী অর্থাৎ ‘জেন জি’-দের নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। যা শুনলে যেমন চমকে উঠতে হয়, ঠিক তেমনই চিন্তায় কপালের ভাঁজও ফেলতে হয়। ব্যাপারটা ঠিক কী? বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আগের প্রজন্মের প্রতিনিধিরা ঠিক যে বয়সে এসে যেভাবে যৌন জীবন বা শারীরিক সম্পর্ক উপভোগ করতেন, জেন জি-র তরুণ প্রজন্ম সেই তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। অর্থাৎ, তাঁদের মধ্যে শারীরিক মিলনের ফ্রিকোয়েন্সি বা হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে! সহজ কথায়, শরীরী খেলায় মেতে ওঠা আর পছন্দ করছে না নয়া প্রজন্মের তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা। 

আমেরিকার বিখ্যাত ‘জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে’ (GSS)-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সমাজবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যৌন সক্রিয়তা এবং সেক্সুয়াল পার্টনারের সংখ্যায় একটা স্পষ্ট পতন লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু কেন এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বিছানায় এত ‘নিস্পৃহ’? এর পেছনে উঠে এসেছে ৪টি বড় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

 

 

১. ডিজিটাল দুনিয়ার বাড়বাড়ন্ত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন গেমিংয়ের দুনিয়া জেন জি-র জীবনকে হাতের মুঠোয় এনে দিলেও, তাঁদের বাস্তব জগত থেকে অনেকটাই দূরে ঠেলে দিয়েছে। ‘ইনস্টিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজ’ (IFS)-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের বাস্তব জীবনের বা ‘অফলাইন’ সামাজিকতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। মানুষ এখন মুখোমুখি আড্ডা দেওয়ার চেয়ে স্ক্রিনের ওপারে চ্যাট করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে স্বাভাবিক উপায়ে কোনও রোমান্টিক বা শারীরিক সম্পর্কের সুযোগ তৈরি হওয়ার রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

২. আর্থিক চাপ ও মা-বাবার সাথে সহবস্থান

বর্তমান যুগের আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচ, পড়াশোনার ঋণ এবং বাড়িভাড়ার অতিরিক্ত খরচের কারণে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক জেন জি তরুণ-তরুণী পড়াশোনা বা চাকরি করার পরও মা-বাবার সাথে একই বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ‘বুমেরাং’ জীবনযাত্রার (Boomerang Living Situation) কারণে তরুণ প্রজন্মের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নিজের আলাদা ঘর বা থাকার জায়গা না থাকায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ও মানসিকতা— দুই-ই হারাচ্ছে এই প্রজন্ম।

৩. সম্মতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। জেন জি প্রজন্ম পারস্পরিক সম্মতি বা ‘কনসেন্ট’ এবং ব্যক্তিগত সীমানা (Personal Boundaries) নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সংবেদনশীল। ক্যাজুয়াল বা ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ডের মতো ক্ষণস্থায়ী শারীরিক সম্পর্কের চেয়ে তাঁরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। ‘উচ্ছ্বসিত সম্মতি’ (Enthusiastic Consent)-র সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার কারণে যেকোনও রকম জোর করে বা অতৃপ্তিদায়ক শারীরিক সম্পর্ককে সরাসরি ‘না’ বলার মানসিক সাহস দেখাচ্ছে এই প্রজন্ম।

৪. ডেটিংয়ের ধরন বদল ও ইন-পার্সন জড়তা

বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে তরুণদের আলোচনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে জেন জি-র একটা বড় অংশ মুখোমুখি কথা বলা বা ডেটিং করার ক্ষেত্রে একধরণের সামাজিক জড়তা ও ফোবিয়ায় ভোগেন। তাছাড়া, বাস্তবে কোনও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যে মানসিক বা শারীরিক তৃপ্তি পাওয়া যায়, অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্ট ও ভার্চুয়াল যাচাইয়ের মাধ্যমে তার বিকল্প খুঁজে নিচ্ছেন।

প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার এবং বাস্তব পৃথিবীর কঠিন আর্থিক পরিস্থিতি যে তরুণ প্রজন্মের ব্যক্তিগত জীবনকে কতটা প্রভাবিত করছে, জেন জি-র এই যৌন সম্পর্ক নষ্ট হওয়া তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।