অনেকেই মনে করেন, পুরুষের স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর সংখ্যা বেশি থাকলেই সহজে বাবা হওয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। একজন পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা নির্ভর করে শুধু শুক্রাণুর সংখ্যার উপর নয়, বরং সেই শুক্রাণুর গুণমান বা স্পার্ম কোয়ালিটি-র উপরও। অনেক সময় রিপোর্টে স্পার্ম কাউন্ট স্বাভাবিক থাকলেও, শুক্রাণুর মান খারাপ হওয়ার কারণে সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, একটি সুস্থ শুক্রাণুর তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মোটিলিটি বা চলাচলের ক্ষমতা। শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছতে হলে দ্রুত এবং সঠিকভাবে এগোতে হবে। যদি শুক্রাণু ঠিকমতো চলাচল করতে না পারে, তাহলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

দ্বিতীয়ত, মরফোলজি বা শুক্রাণুর আকৃতি। একটি সুস্থ শুক্রাণুর মাথা, ঘাড় ও লেজ স্বাভাবিক হওয়া দরকার। আকৃতিতে ত্রুটি থাকলে তা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পারে না।

তৃতীয়ত, ডিএনএ-র গুণমান। শুক্রাণুর ভিতরে থাকা জিনগত তথ্য যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নিষেক হলেও গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বা ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি শুক্রাণু কতটা সুস্থ, সেটাই আসল বিষয়।

বর্তমান জীবনযাত্রার কারণে অনেক পুরুষের স্পার্মের গুণমান কমে যাচ্ছে। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, জাঙ্ক ফুড বেশি খাওয়া, স্থূলতা, দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং শারীরিক পরিশ্রম না করার মতো অভ্যাস শুক্রাণুর মান নষ্ট করতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিস, হরমোনের সমস্যা, সংক্রমণ, ভ্যারিকোসিল (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া), কিছু ওষুধ এবং পরিবেশ দূষণের প্রভাবও পুরুষের প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্পার্মের গুণমান ভাল রাখতে প্রতিদিন সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, তাজা ফল, বাদাম, মাছ, ডিম এবং জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই-সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। নিয়মিত ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং মানসিক চাপ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহল যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভাল।

যদি এক বছর ধরে নিয়মিত যৌনমিলনের পরও বাবা হওয়ার পথে ব্যর্থ হন, তাহলে পুরুষেরও ফার্টিলিটি পরীক্ষা করানো জরুরি। বর্তমানে সিমেন অ্যানালাইসিস পরীক্ষার মাধ্যমে স্পার্ম কাউন্ট, মোটিলিটি, মরফোলজি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সহজেই জানা যায়। রিপোর্টে সমস্যা ধরা পড়লে ওষুধ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা প্রয়োজনে বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, বাবা হওয়ার জন্য শুধু বেশি সংখ্যক শুক্রাণু থাকাই যথেষ্ট নয়। সেই শুক্রাণু কতটা সুস্থ, কতটা সক্রিয় এবং ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার ক্ষমতা রাখে, সেটাই আসল বিষয়। তাই প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।